0006# বড়শিতে আটকানো প্রথম মাছটি
- Sutarang Prakashana

- Jul 22, 2020
- 3 min read
Updated: Jul 23, 2020

দেবব্রত দাস
জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫
মদন, নেত্রকোনা
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
আফিম ও ভালুকের নাচ, ঝিঁঝিঁ পোকাদের ভোজসভা, দশট্রাক মৌনতার ছবি, বাবার অগ্রন্থিত দু:খ, দৃশ্যের বারকোড এবং দণ্ডিত বৃক্ষের কলরোল
সম্পাদিত ছোটকাগজ "সড়ক "
বাবা : সাধন দাস। মা : বীনাপাণি দাস
© দেবব্রত দাস
❑ ডাইনোসর
গতরাতে স্বপ্নে ডাইনোসর দেখলাম।
আমার ঘুমের ভেতর প্রবেশ করে —
বুকে থাকা উদ্যান ও নদী পার হয়ে
পাহাড়ের দিকে এগুচ্ছে।
তার ধস ধস পায়ের আওয়াজ
পাশে শুয়ে থাকা আমার স্ত্রীও শুনতে পাচ্ছিলো।
স্বপ্নে আমি দর্শকের ভূমিকায় ছিলাম
তাই পাহাড়কে অগ্রিম বলতে পারিনি
বলতে পারিনি নদী ও উদ্যানকে ।
অনেক চেষ্টা করেও আমি আমার স্বপ্নের প্লাটফর্ম
পরিবর্তন করতে পারিনি।
কেটে ছেটে ফেলে দিতে পারিনি
ডাইনোসরের উপস্থিতি।
অথচ আজ সারাদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি
আমার ভেতর, আমার বাহির
না পেয়েছি নদী,
না পেয়েছি পাহাড়
শুধু ডাইনোসরের পায়ের ছাপ
আর অজস্র ভাঙাচুরা আমাকে খুঁজে পেলাম।
❑ বড়শি
বড়শিতে আটকানো প্রথম মাছটি
হেসে কথা বললো আমার সাথে
তিনবারের চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর সে যখন
স্থির করলো ; শস্যে যাপন করা
ঘাসফড়িংয়ের সাথে
কথা বলে শিখে নেবে উড়ার কৌশল
এবং লাফিয়ে পড়বে আগুনে।
তখনই বড়শিতে থাকা গোধূলিতে আটকে গেলো।
আমি তার শরীরে ঋজু পাহাড়ের উপস্থিতি দেখলাম।
বড়শিতে আটকানো দ্বিতীয় মাছটি
যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে বলছিলো
দুদিন আগে জন্ম নেয়া সন্তানদের মুখগুলো
জবাফুলের মতো তার হৃদয়ে ফুটে আছে
হাটু গেড়ে বসে থাকা একটা মৃত্যুকে
সে পেরিয়ে এসেছে
শরীরে মমতার ব্যাণ্ডেজ বেঁধে।
আরও বলছিলো -
একটা উজবুক নদীতে বাড়ি করেছি বলে
ভালো লাগছিলো না। তাই বৃষ্টির ছন্দময় বর্ষনে
পথভুলে চলে এসেছি ইজারাকৃত এই হাওরে।
আমি তার হৃদপিণ্ডে হাত রেখে বুঝতে পারছিলাম
একটা বহুগামী সময় তার ভেতরে ঘূর্ণি তুলছে
সপাটে ভেঙে দিচ্ছে সব।
বড়শিতে আটকানো তৃতীয় মাছটির জন্য বসে থাকতে থাকতে
আমার মেয়ের কথা মনে পড়লো
মনে পড়লো বইয়ে আঁকা মাছগুলোকে সে
কতোবার পুকুরে ছেড়ে এসেছে।
আমি তাই বড়শি গুটিয়ে
বাজার থেকে বই নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
❑ পৃথিবী
তিমি তার পরিবার পরিজন নিয়ে সমুদ্রে থাকে
মূলত সমুদ্রই তার পৃথিবী। সেই অর্থে —
আমাদের থেকে অনেকটা বড় তার ঘর-দোর ।
একদিন তার ইচ্ছা হলো নিজের বলয় থেকে বেরিয়ে
দারকিনা - তিতপুঁটির পৃথিবীতে আবাস গড়বে
নিজেকে প্রথমবার দেখাবে
পুরোনো পৃথিবীর নতুন চেহারা।
এই শুনে তিমির সঙ্গী হলো ডলফিন
সেও সংসার জীবনে তেমন সুখী নয়
একটা ডানাওয়ালা সুখের জন্য তার অভিমত পাল্টে
তিমির সঙ্গ নিয়েছে।
চূড়ান্তভাবে বোঝাপড়া শেষে
বরফমাখা সময়গুলো গহ্বরে নিয়ে
পৌঁছলো দারকিনা - তিতপুঁটির
পৃথিবীতে।
যাত্রা শেষে প্রতিবেশীদের সমুদ্রে যাবার
আমন্ত্রণ জানিয়ে
সাঁতরাতে শুরু করলো —
এ যেন নিজেদের ক্রয়কৃত উদ্যান।
এই দেখে দারকিনা - তিতপুঁটিরা
সাঁতার ভুলে —
মানুষের পৃথিবীতে হাঁটতে শুরু করলো।
❑ রঙিন মাছের সমুদ্র
১
তোমার কথা মনে হবার পর
হৃদয়টা সজারুর মতো
অপার্থিব কাটায় ভরে উঠলো
তাই একটা ছন্দময় শব্দের ভেতর
তোমাকে খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কার করছিলাম।
২
সেদিন জঙ্গলে গিয়েছিলাম
ভেতরে জমে উঠা আহত কিছু দুঃখের
শুশ্রূষার জন্য
সারাদিন ঘুরে ঘুরে সারিবদ্ধ গাছের দুঃখ দেখেছি
হরিণের দুঃখ দেখেছি
ঘাসের দুঃখ দেখেছি
আর শেষ বিকেলে বাড়ি এসে
আরো নতুন কিছু দুঃখের উপস্থিতি দেখলাম।
৩
মহল্লার বিয়ে বাড়িতে তুমুল বাজনা বাজছে
বাজনার সাথে সাথে আমার মন নৃত্য করছে
আমি তাকে না করা স্বত্তেও
বাহির দিয়ে কপাট লাগিয়ে চলে গেছে ।
আমিও ভাবছি ভেতর থেকে দরোজা আটকে দিয়ে
একাই থাকবো।
অথচ বহু আগে থেকেই ঘরের ভেতর বসে আছে
একটা কালো বেড়াল
৪
যখন অঝোর বৃষ্টির ভেতর তোমাকে ভাবছিলাম
তখনই হুট করে একটা হাতি ঢুকে গেলো
মাহুতকে তাড়া করতে করতে
তোমাকে আর ভাবতে পারছিলাম না
শুধু মস্ত এক হ্রদ চোখের সামনে দুলছিলো।
৫
হৃদয়ে প্রবাহিত হওয়া ও আমার বিবস্ত্র নদী
এসো অক্ষরের মধ্যকার দূরত্বে লীন হয়ে যাই
তারপর শেষমেশ ফিরে আসি
রঙিন মাছের সমুদ্র নিয়ে।
❑ লাটাগুড়ির জঙ্গলে
লাটাগুড়ির জঙ্গলে কবিকে হারিয়ে
চিৎকার করে যখন ডাকছিলাম
তখন জঙ্গলের ভেতর থেকে শুয়োর বেরিয়ে এলো
সারা গায়ে তার গুমোট নগরের দুঃখ।
পেঁজা তুলোর মতো মাটিকে রক্তাক্ত করে সে
বৃষ্টিময় করে তুলছে
একটাও চুম্বন আর অবশিষ্ট নেই।
লাটাগুড়ি জঙ্গলে দ্বিতীয় গুলি খেয়েও পালিয়ে যাওয়া
বন্য শুয়োরকে খুঁজতে গিয়ে
খুঁজে পেলাম কবিকে।
তার ডান পাঁজর থেকে তীব্র বেরিয়ে যাওয়া মেঘ
তৈরি করছিলো কারফিউ ।
সারা শরীরে গাছের কয়েক'শ পাখির
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার দাগ
ক্রমে মুছে যাচ্ছিলো
গুচ্ছ গুচ্ছ জোনাকি আগাম ঘোষণা ছাড়াই
রেডিওগ্রামে জানিয়ে দিচ্ছিল
কবির মৃত্যু।
অবশেষে কবিকে ডাকলাম —
সুনীলের নীরাকে ডাকার ভঙ্গিমায়
কবি কোনো সারা দিলেন না
বুঝলাম পুরো লাটাগুড়ি জঙ্গল
কবির ভেতর হারিয়ে গেছে
সেই সাথে আমিও ...



Comments