0009# পৃথিবীর জন্মান্ধ হৃদয় মেঘ হয়ে গেলে
- Sutarang Prakashana

- Jul 23, 2020
- 2 min read

পহেলী দে
জন্ম : ২৭।০৭।১৯৮৫ গ্রাম : কেচিয়াপাড়া, পটিয়া, চট্টগ্রাম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : প্রকৃতি পাঠের আঠারো অধ্যায় বর্তমানে শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত।
© পহেলী দে
❑ ঘুমের ঘোরে
আজ অব্দি ঘুমের প্রতি কোনো অনীহা
আমাকে স্পর্শ করেনি
ঘুমের রাজকীয়তা বরাবরই মোহিত করে
আমাকে দিয়েছে সুনিবিড় নিঃসঙ্গতা
ভুলের থাকবার বুনো মন্ত্রণা
আমি তাই সময়ে অসময়ে ঘুমের পাহাড়ে
দুঃখ ফোটাতে যাই।
মাঝে মাঝে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে আকাশ
আমরা গলাগলি করে ঘুমের রাজত্বে
অস্তিত্বের ঘ্রাণ বুনে যাই আর
অবচেতনে ভরে তুলি অমীমাংসিত যত বাগানবাড়ি
পৃথিবীর জন্মান্ধ হৃদয় মেঘ হয়ে গেলে
পেয়ে যাব নিরুদ্দেশ যাপনের গ্রীন সিগন্যাল
ব্রেইল বিদ্যা আয়ত্তে আসার পর
আমি ও আকাশ স্বৈরতন্ত্রের জীবন হতে
পালিয়ে যাব পরিণত গন্তব্যের শেষ উপত্যকায়
যেখানে পাখিদের পুনর্জন্মে মুদ্রিত হবে
উদ্ভ্রান্ত যুবকের ফেলে আসা প্রেমিকার হাসি।
আমাদের জড়াজড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা
বারান্দাও ঘুমায় ঘোড়ার মত
ঘুমের ঘোরে আমরা অতিক্রম করি
তিস্তার ভাঙন, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফুলে ওঠা পদ্মার বুক
এবং মানচিত্র হতে মুছে যাওয়া যত গ্রাম।
❑ উপেক্ষার বর্ষণ
সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজলাম
তবু উপশম পেল না হৃদয়ের অরণ্য
ছোপ ছোপ রক্ত ফুটে আছে পাতার ফাঁকে ফাঁকে
মগডাল ছাই হলো উপেক্ষার বর্ষণে।
এক আষাঢ় স্বপ্ন নিয়ে যে নদী ঘর ছেড়েছিল
ফেরার পথে কুড়িয়ে আনে ধুলোর প্রবঞ্চনা,
দুঃখ তাড়ানিয়া রোদে প্রতিবিম্বিত শরীর বেয়ে
নেমে আসে ঝড়ের ঘূর্ণি
চিরল জলের ডগায় শুয়ে থাকে আকাশ নামের ভ্রম।
মাছেদের শহরে সূর্যাস্ত নামে
অন্ধকার ঘনীভূত হলে ফিনিক্স পাখি
ফিরে পায় পারিবারিক পাঠশালা
সম্পর্কের দোতারায় বেজে ওঠে আত্মার মূর্ছনা।
ঘন জঙ্গলে পথ হারিয়ে একজোড়া ডাহুক
অবিশ্রান্ত উড়ে যায় বিষণ্নতার দিকে
উপশমহীন অশ্রুবিন্দু বৃষ্টিপতনের শব্দে মাপে
মাটির গভীরতা,
সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজলাম
তবু সিক্ত হলো না ঘাসফুল হৃদয়,
চোখের সামনে ভিজে চুর হলো
মফস্বলের বিবাহযোগ্য আধুনিকা,
ব্যাঙের ছাতার মত টিনের বাড়ি
বড়পুকুরের নিপাট যৌবন।
❑ জলসাঘর
গলায় করোনা ফুল ফুটেছে
তোমার খোঁপায় ফোটা কদম ফুলের মত
আমাকে নাও বর্ষারানী
পাহাড়ে ঢল নেমেছে
পানি বাড়ছে, শঙ্কা বাড়ছে, সংখ্যা বাড়ছে
ধসে পড়বার আগে তুলে নাও
মৃন্ময় চোখের ক্রন্দন।
শেষ রোদে তোমার ছায়া দেখলাম
পুনর্বার বেঁচে ওঠার তীব্রতায় হাত বাড়ালাম
আমাকে নাও বৃষ্টি ধৌত বেদনা।
তোমাদের নগরে এখনো
আত্মহত্যারীতি প্রচলন হয়নি
এখনো কিছু দুঃখ ফোটে রক্তজবার মত
কিছু ভুল পথে পড়ে থাকে বকুলের সাথে
আমি তাদের অবশ হৃদয়ে উপশম হব
তুমি আমাকে নাও সুরার পেয়ালা
আকণ্ঠ পান কর প্রেমের মদিরা
চুমুকে চুমুকে ভরে উঠুক জলসাঘর।
❑ ভাঁটফুলের জীবন
মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে
একটি চন্দ্রাহত রাত ঢুকে গেল ফুসফুসে
আমি তখন একলা ঘরে ফুলদানিতে রাখা কদমকে পরজীবী ফুল ভেবে দূরত্বের অংক কষছিলাম।
শেষবার আত্মহত্যার জন্য
কবে পাহাড়ে উঠেছিলাম মনে নেই
আয়নায় দেখেছিলাম ভীষণ প্রিয় উনিশ বছর বয়স
কালো চোখে জোছনা লুকিয়ে একাই কেঁদেছিলাম
সেসব দৃশ্যপট এখন সাবান জলে ধোয়া দুপুর
চিরহরিৎ করচ কবে ভস্ম হয়েছিল চাঁদের ভাসানে
মনে পড়ে না
মনে পড়ে না
মনে পড়ে না।
শোবার ঘর, ইচ্ছের আলখাল্লা ইত্যাদি সোমত্ত স্বপ্ন
আমাকে টেনে নিচ্ছে দরোজার ওপারে
প্রতিশ্রুতির নাদান পথে পথে
আমি তাদের গলা টিপে দেখাতে চাই ভাঁটফুলের জীবন
তোমার লেখা শেষ চিঠি আর হলুদ পাতা
ঝরে যাবার প্রাক্কালে জানিয়েছে
নিয়ত বয়ে যাওয়ার অন্তর্বাসেই বেঁচে থাকে
পাললিক প্রেম।
❑ জন্মান্ধের জতুগৃহ
হৃদয়ের পাশ ঘেঁষে একটা ঝর্ণা ছুটে অবিরত
ভাসিয়ে নেয় মন কেমনের অসুখ
পাথরকুচি জীবন বেঁচে যাওয়া নির্যাস
কূলভাঙা ঢেউয়ের অবিশ্রান্ত কান্না
ভাসিয়ে নেয় দুঃখের সাত নুড়ি হার,
বঞ্চনার দাগ ধুয়ে কদমের হাসি
তুলে দেয় চোখেমুখে
হেসে ওঠে পরিযায়ী সকাল।
একটি কাঠঠোকরা রোজ কাটে বেদনার বাঁপাশ
বৃক্ষ শরীর বেয়ে নামে একাকীত্ব
ভিজে যায় প্রাপ্তবয়স্ক যত ইন্দ্রিয়
অবাধ্য স্বপ্নের জারুল,
আশ্চর্য ফুলের ফোয়ারা উপচে পড়ে রোদ্দুরে বাগান
প্রবঞ্চক শহরে জন্ম নেয় অপুষ্পক ছায়া
পাখিদের জন্য অপেক্ষমান গুলিবিদ্ধ আকাশ
আমার দুঃখগুলো কখন মেঘ হয়ে গেছে
টের পায়নি রাতের তারা, জন্মান্ধের জতুগৃহ
হৃদয়ের পাশ ঘেঁষে ছুটে চলা ঝর্ণাই
মূলত আমার প্রেম
বিষাদের ভূগোলে ভেসে বেড়ানোর উদ্দিপনা।



Comments