top of page

সাক্ষাৎকার # " আমার লেখা আমার আত্মজীবনীর অংশ নয়--"

  • Writer: Sutarang Prakashana
    Sutarang Prakashana
  • Jul 30, 2020
  • 9 min read

Updated: Jul 31, 2020




গল্পকার ও ঔপন্যাসিক সুব্রত বসুর সঙ্গে তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে কথা বলেছেন অবগুণ্ঠন পত্রিকার সম্পাদক কবি ও গল্পকার অমিতাভ দাস।


© অমিতাভ দাস ও সুব্রত বসু



অমিতাভ: আপনার ছোটবেলার কথা কিছু বলুন ।

সুব্রত: আমার জন্ম হাওড়া শহরে, বাবা স্টেট ব্যাংকের অফিসার ছিলেন, বদলীর চাকরী, ফলে ছেলেবেলার অনেকটাই কেটেছে কখনো বেতিয়া, গিরিডি, বিহারশরিফ, পাটনায়। এর মধ্যে বেতিয়া ও গিরিডি ভীষণভাবে প্রভাব ফেলেছিল পরবর্তীকালেও। বেতিয়ায় আমার তখন তিন বছর বয়স, হলেও বেশ কিছু স্মৃতি এখনো উজ্জ্ব্ল । তবে গিরিডির স্মৃতি তার থেকেও স্পষ্ট। ওখানেই আমার হাতেখড়ি হয়। যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম ভীষণ পছন্দের, নাম ছিল সোনাভিলা। লোহার গেট থেকে সুরকি আর ছোট নুড়ি ঢালা রাস্তা, দুদিকে স্পাইডার লিলির গাছ, প্রায় আট ন”টা সিঁড়ি উঠে বিশাল চাতাল, দুদিকে দুটো বসার জন্যে চওড়া পৈঠা, দুপাশে দুটো শিউলি গাছ মাথায় ছায়া করত।শরৎকালের সকালে পৈঠা দুটো ভরে থাকত সাদা শিউলিফুলে। আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল, গোলাপজাম পেয়ারা নানান ফলের গাছ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা প্রায় এক একর জমিতে।সেখানেই খরিশ গোখরো আরো অনেক বিষধর সাপের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। বাড়ীর কাছেই ছিল উস্রী নদী,মাঝে মাঝে হড়পা বানের শব্দ বাড়ি থেকেই শোনা যেত। গিরিডির যে আরো কত স্মৃতি স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। সেই বাড়ী এমনই প্রভাব ফেলেছিল প্রায় তিপান্ন বছর পর গিরিডি গিয়ে সেই বাড়ি আমি খুঁজে পাই, ছবিও তুলে আনি।

দাদার পড়াশুনার জন্যে আমরা হাওড়া চলে আসতে হয়, বাবা তখন মুঙ্গেরে। হাওড়া এসে আমার খুব মারাত্মক অসুখ করে, বাঁচার আশা ছিল না বললেই চলে, সামান্য সেরে ওঠার পরও চলাফেরার শক্তি ছিল না। আমি দ্বিতীয় বার হাঁটতে শিখি। জ্ঞানতঃ শক্তি অর্জন করে নিজের পায়ে পুনরায় চলতে পারার স্মৃতি বর্ণনাতীত।সেকথা কিছুটা আমার সত্যি খেলার গল্প’এ লেখা আছে। যখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি, আমার মা রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা পড়ে শোনাতেন, স্মরণ থেকেই শিশু কাব্যগ্রন্থ এর দু’একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন । সেই আমার প্রথম রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয়। মা খুব ভাল গান করতেন,কিন্তু বাবা ঠাকুমার অপছন্দে মায়ের গায়কী প্রতিভা সংসারের মরু পথে হারিয়ে গিয়েছিল দ্রুতই।


অমিতাভ: কবে থেকে লেখার জগতে এলেন ? প্রথম লেখা কোন কাগজে কবে প্রকাশ পায় , মনে আছে ?

সুব্রত: আমাদের সময় প্রায় সব ছেলেই কলেজে ঢোকার সাথে সাথে অল্পবিস্তর সাহিত্য চর্চা ও কবিতা লেখা শুরু করত । আমিও তার ব্যতিক্রমী ছিলাম না , তবে সেগুলি আদৌ কবিতা হয়েছিল কিনা সন্দেহ, পাশাপাশি গল্প ও প্রবন্ধ লিখতাম। স্পুটনিক নামে একটি স্বলায়ুর লিটিল ম্যাগাজিনে আমার প্রথম একটি ছোট গল্প ছাপা হয়, তখন অণুগল্প বলে আলাদা কোন শ্রেণীবিভাগ হয়নি বাংলা সাহিত্যে। গল্পটি পড়ে শ্রদ্ধেয় বনফুল পরামর্শ দিয়েছিলেন, প্রতিদিন কাগজ কলম নিয়ে বসার, লিখি আর নাই লিখি। তা আমার কোনদিনই পালন করা হয়নি। আমার ঠাকুমা তাঁর জীবনের অনেক কথা বলতেন, যেমন ভূত, ডাকাত, ঠ্যাঙ্গাড়ে, সাপও তার ওঝা ইত্যাদি, বলতেন অত্যন্ত বিশ্বাসের সঙ্গে।সেগুলি অবিশ্বাস্য হলেও আমরা বিশ্বাস করতে কুণ্ঠাবোধ করতাম না। সিরিয়াসলি লেখালিখি শুরু করি ২০০৪ সাল থেকে, মূলতঃ গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস।তখনই মনে হয়েছে যাই লিখি না কেন বিশ্বাসের সঙ্গে লিখতে হবে, না হলে তা পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। অভিমানী কবিতা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন তাই আর লিখি না।


অমিতাভ: শুনেছি গ্রুপ থিয়েটার করতেন। এখন করেন না। সেই অভিনয় জগতের কথা কিছু শুনি।নাটক ছাড়লেন কেন ?

সুব্রত: প্রায় আটবছর গ্রুপ থিয়েটার করেছি, আমাদের গ্রুপের নাম নট-রঙ্গ, তারা এখনো কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করে, বতর্মানে দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশী নাটকটি অভিনীত হচ্ছে। এখন যে পরিচালক সোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা প্রফেসর সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমার নাটকের হাতেখড়ি। কলকাতা হাওড়া বিভিন্ন শহরতলী ছাড়াও মুম্বাই, এলাহাবাদেও নাটক করতে গেছি।অভিনীত নাটকগুলির মধ্যে, সধবার একাদশী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ফজল আলি আসছে, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের খড্ডা, বনফুলের কবয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুক্তধারা, বৈকুন্ঠের খাতা বাদল সরকারের কবিকাহিনী ইত্যাদি। সম্প্রতি সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন তাঁকে নিয়ে বড় লেখা ব্লগে লিখছি।

না এখন আর অভিনয় করি না, পুলিশের চাকরীর জন্যেই অনিবার্য ভাবে ছেদ টানতে হয়েছিল অভিনয়ের। আমার শেষ অভিনয় ১৯৯০ সালে ২রা অক্টোবর সধবার একাদশী নাটকে ঘটিরাম ডেপুটির চরিত্রে।


অমিতাভ: কর্মজীবনে পুলিশের দায়িত্ব সামলে কীভাবে লিখতেন ? কর্মজীবন কি আপনার লেখার ক্ষতি করেনি ?

সুব্রত: চাকরী প্রথম দিকে একেবারেই লেখালিখি করতে পারিনি, বিশেষতঃ থানার দায়িত্ব মাথায় নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি র মধ্যে লেখার সময় ও ইচ্ছে কোনটাই থাকত না। ১৯৯৪ সালে শেষের দিকে বেশ কিছুটা অবিচারের শিকার হই, কারণটা আন্দাজ করতে পারি কেউ ওপরওলার কান ভাঙ্গিয়ে ছিল। সেই সময়ই একাগ্রভাবে চাকরী করা থেকে মনটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লেখালিখির কাছে ফিরে যাব কিনা এই ভাবনায় আরো কয়েক বছর চলে যায়। যে কোন শিল্প বড় অভিমানী। একবার ছেড়ে গেলে ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগে। অল্প অল্প সুরু করলেও মনঃপুত হচ্ছিল না, সেই সময় কুচবিহার মাথাভাঙ্গায় বদলী হই, সেখানে সাহিত্যে একটা অদ্ভুত পরিমন্ডল খুঁজে পাই সঞ্জয় সাহা, নিত্য মালাকার, সন্তোষ সিংহ, অনুভব সরকার কমল সাহা এদের সান্নিধ্যে। পুলিশী চাকরী একদিকে যেমন লেখালিখির ক্ষতি করেছে, অন্যদিকে দিয়েছে বিপুল অভিজ্ঞতা


অমিতাভ: বিষণ্ণ দুপুর আপনার একমাত্র প্রকাশিত উপন্যাস । সেখানে শুভ চরিত্রটিকে এভাবে আঁকলেন কেন ? একটু ব্লাক মনে হল--

সুব্রত: বিষণ্ণ দুপুর উপন্যাসে শুভ চরিত্রটি আমি খুব সচেতন ভাবেই তৈরী করেছি। কেন আপনার ব্লাক মনে হল বলতে পারব না, শুভ যথেষ্ট স্পিরিটেড,প্রতিবাদী। ভাগ্যের আনুকূল্য না পাওয়ায় কিছুটা অবষাদগ্রস্থ। সেই জন্যে হয়ত ব্লাক মনে হতে পারে। পাঠকের ভাবনা ভিন্নরকম হতেই পারে লেখকের সঙ্গে মিলবে এমন কোন সর্ত নেই। নায়ক মানেই যে দেবতুল্য হবে এর কোন মানে নেই। এই উপন্যাসে উত্তরণের ইঙ্গিত আছে মাত্র, বরুণদা যখন তাকে আবার তাকে ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। শুভর মত অনেকেই আমাদের সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিষণ্ণ দুপুর’এ তাদের কথাই বলতে চেয়েছি


অমিতাভ: নিজের লেখালিখি সম্পর্কে কী ধারনা আপনার ?

সুব্রত: নিজের লেখা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই ভয় হয় আত্মপ্রচার না হয়ে যায়। আমার লেখা সম্বন্ধে অন্যেরা বলবেন সেটাই কাঙ্খিত। যেটা লিখি সেটা নিজের বিশ্বাস থেকে লিখি। লেখার ব্যাপারে আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, লেখার পর নিজেই বুঝতে পারি কোনটা হল আর কোনটা হল না। বর্তমানদিনে যাঁরা লিখছেন তাঁদের সঙ্গে আমার খুব একটা ফারাক আছে বলে মনে করি না। ভাল লেখা না হলে লিখব না, Produce more and produce rubbish আমি এই তত্ত্বে বিশ্বাসী।


অমিতাভ: একদিন অণুগল্প-ই শাসন করবে বাংলা গল্প সাহিত্যকে-- আপনার কী মনে হয় ?

সুব্রত: আমি তা মনে করি না যে অণু গল্পই বাংলা গল্প সাহিত্যকে ভবিষ্যতে শাসন করবে, যদিও অণু গল্প সম্পর্কে নানা রকম ধারণা আছে। কোন গল্প ছোট হলেই তা অণুগল্প হয় বলে আমি মনে করি না। কম কথায় গল্পের অন্তনিহিত ব্যাপ্তিটিকে পরিস্ফূট করে পাঠকের জন্যে যা থাকবেতা যেন দুর্বোধ্য না হয়, গল্পের অভিমুখ তীক্ষ্ণ হতে হবে। তবেই তা সার্থকতা লাভ করবে। এটা সম্পূর্ণ আমার মত। গিমিক বা পাঠকের মাথার ওপর দিয়ে চালিয়ে দেবার প্রবনতা অণু গল্পের ক্ষতি করবে। আজকের দিনে সাহেব বিবি গোলাম, বা কড়ি দিয়ে কিনলাম এর মত উপন্যাস কেউ লেখেন না। ছোট গল্পও দুই থেকে তিন হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে।একনিষ্ট পাঠকের জন্যে তো তা রইলই। তবে গতিময় জীবনে সেগুলি পড়ে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দিতে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করবেন। তাই অণু গল্প শাসন না করলেও একটি স্বতন্ত্র জায়গায় বাংলা সাহিত্যে অবশ্যই থেকে যাবে। সাহিত্য তো বহতা নদী, আজকে দিনে অণু গল্প নিয়ে যে চর্চা হচ্ছে সেটাই তার প্রতিফলন।


অমিতাভ: আজকের দিকে ছোটগল্প ও অণুগল্পের প্রাসঙ্গিকতা কোথায় ?

সুব্রত: ছোটগল্প ও অণু গল্পের প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সম্পাদকের ওপর। অপ্রিয় হলেও মেনে নিতে হয় লিটিল ম্যাগাজিন অপেক্ষা বাণিজ্যিক পত্রিকা অনেক বেশী পাঠকের কাছে পৌঁছায়। একটা সময় তো ছিল যখন বিভিন্ন পত্র পত্রিকা পাঠকের রূচি ও বোধ তৈরী করত। সেই পত্রিকা প্রকাশের জন্যে অপেক্ষা পাঠক উন্মুখ হয়ে । পত্রিকার একটা নিদিষ্ট পাঠক গোষ্ঠী তৈরী হত। যদিও বলবেন পাঁচের দশকের আগের কথা, কিন্তু তার পরেও দেশ অমৃত, কৃত্তিবাস প্রভৃতি পত্রিকার একটা নিদিষ্ট পাঠক ছিল। সম্পাদক গোষ্ঠী শিল্পের সঙ্গে বাণিজ্যের সমঝোতার কথা কখনো ভাবতেন না। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে লেখক, কবির সংখ্যা কিছু কম নয়। গোষ্ঠী ক্ষুদ্র হলেও কিছু মানুষের কাছে তাদের লেখা পৌঁছে যাচ্ছে দ্রুত। কিন্তু সত্যিকারের ভাল লেখা কটা হচ্ছে। বন্ধু বান্ধবীদের একতরফা পৃষ্ট কুন্ডয়নের ফলে, যথার্থ সমালোচিত না হওয়ায় লেখক বা কবির কোন দায় থাকছে নিজেকে ভাঙ্গবার বা নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটনোর। নামকরা বাণিজ্যিক পত্রিকায় এমন কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে, সংশয় থেকে যাচ্ছে সম্পাদক মন্ডলীর মননশীলতার ওপর, সাহিত্য চেতনা ও বোধের ওপর। এভাবে চলতে থাকলে সত্যিই প্রাসঙ্গিকতা হারাবে ছোটগল্প, অণুগল্প।


অমিতাভ: আপনার মুখে অনেক অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক গল্প শুনেছি । সেগুলি লিখছেন না কেন ?

সুব্রত: আমার নিজের কিছু অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা আছে। এর অস্তিত্বও আমি বিশ্বাস করি। আমি মনে করি জ্ঞান একটী বিরাট স্তর, বিজ্ঞান তাকে স্পর্শ করার জন্যে নিজের উচ্চতা ক্রমশঃ বাড়িয়ে চলেছে।এখন জ্ঞানের সেই অদেখা শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছতে পারেনি। তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞান আমাদের যা জানিয়েছে, তার বাইরের আর কিছু নেই বা হতে পারে না। সেক্সপীয়ারের হ্যামলেট নাটকের সেই বিখ্যাত উক্তি- There are more things in heaven and earth, Horatio, Than are dreamt of in your philosophy.এই বিষয় নিয়ে দুটি ঘটনার কথা লিখেছি, বগুলা থেকে প্রকাশিত দোলনা পত্রিকায় এই সম্পর্কিত একটি লেখা আছে। এই নিয়ে বেশী লেখার ইচ্ছে নেই , কারণ লেখক চিহ্নিত হয়ে যান। যা জনপ্রিয়তা অপেক্ষা ক্ষতি করে বেশী।

অমিতাভ: আপনার নিজের জীবন-ই কী গল্পে নানা ভাবে আসে মানে আপনার লেখাই কী আপনার আত্মজীবনীর অংশ ?

সুব্রত: নিজের জীবনের কথা নিজের মৌলিক লেখায় প্রকাশ করা লেখকের দুর্বলতার লক্ষণ, কথাটা আমার নয়, হেমিংওয়ের। নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে রেখে গল্প বা উপন্যাস লেখা সত্যিই শক্ত। কোথাও না কোথাও তার ছাপ বা ছায়া চলে আসে। আমার জীবনে আসা নারীরা আমার গল্পে উপন্যাসে আসেন ভিন্ন রূপে। লেখার সময় তার চেহারা visualize করি, কিন্তু চারিত্রিক গুণ অপগুণগুলি পালটে যায়। ফলে গল্পে বা উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্রটি স্বতন্ত্র হয়ে থাকে, রক্তমাংসের মানুষটি আর থাকেন না সেই লেখায়। আমার লেখা আমার আত্মজীবনীর অংশ নয়। আত্মজীবনী লেখার সাহস এখনো অর্জন করতে পারিনি।


অমিতাভ: আপনার সময়ের কাদের লেখা ভালো লাগে ? কাদের লেখা মনে ছাপ ফেলেছে ?

সুব্রত: আমাদের সময় তো সাহিত্যের স্বর্ণ যুগ, কাকে ছেড়ে কার কথা বলব। শরৎ চন্দ্র বঙ্কিম চন্দ্র রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ,বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল মিত্র এঁরা ঠিক আমাদের সময়ের নন। ষাটের দশকের শেষের থেকে সত্তরের দশক সেই সময় যাঁরা সাহিত্য জগতে বিচরণ করছেন, তার মধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু ও কালকূট, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী বনফুল শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ সান্যাল,মতি নন্দী, বুদ্ধদেব গুহ আর কত নাম করব। পুজোসংখ্যায় এনাদের লেখা পড়ার জন্যে সারা বাংলার পাঠককূল উদগ্রীব হয়ে থাকত। যে লেখাগুলি ছাপ ফেলেছিল, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, গণদেবতা, কবি, বিবর, শিকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে,গঙ্গা, অমৃতকুম্ভের সন্ধানে, কোথায় পাব তারে, অসময়, ভুবনেশ্বরী, এখনই, বনপলাশীর পদাবলী তুঙ্গভদ্রার তীরে, বিশ্বাসঘাতক, দ্বাদশ ব্যক্তি, নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান, সেই সময়, প্রথম আলো, ঘূণপোকা, কাগজের বউ ফজল আলি আসছে নাট্যরূপ দিয়ে নাটকও করেছি, মাধুকরী, কোয়েলে কাছে। যদিও এগুলি হিমশৈলের চূড়া মাত্র, আরো কত বাকী থেকে গেল। প্রতিটি লেখার সঙ্গে এক একটি স্মৃতি। সল্প পরিসরে তা বর্ণনা করা যাবে না।


অমিতাভ: এই সময়ে কাদের গল্প আপনার ভালো লাগে ?

সুব্রত: এই সময় যারা লিখছেন বেশীর ভাগ সময়েই তাঁদের লেখা পড়ে খুব আনন্দ পাইনা। তারই মধ্যে স্বপ্নময় চক্রর্বতী, সৌরভ মুখোপাধ্যায়, বিপুল দাস, কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যাইয়ের (দুটি উপন্যাস মনে খুব দাগ কেটেছিল, ১) কালযাত্রী, ২) স্পর্শ) এছাড়া সৈকত মুখোপাধ্যায়, আনসারুদ্দিন, পুরানোদের মধ্যে সমরেশ মজুমদার, তিলোত্তমা মজুমদার,হাসান আজিজুল হক, রবিশঙ্কর বল নলিনী বেরা মিহির সেনগুপ্ত, অভিজিৎ সেন এনাদের লেখা যেখানে দেখতে পাই পড়ে ফেলি।সম্প্রতি শুভংকর গুহর বিয়োর খুব ভাল লাগল।

অমিতাভ: আপনি বড় ছোট মাঝারি-- সব কাগজে লিখেছেন ? নিজেকে বড় পত্রিকা না লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক মনে হয় ?

সুব্রত: আমি লিখতে ভালবাসি, যাঁরা ভালবেসে গল্প ছাপেন আমি কৃতার্থ হই। তাবলে নিজেকে নিদিষ্ট কোন পত্রিকার লেখক বলে পর্যায় ভুক্ত করতে পারি না।আমি সব ধরণের পত্রিকাতেই লিখি।যেচে লেখা পাঠাতে কিছুটা অনীহা আছে। সেটা মেয়েরাই করে দেয়। তবে আমন্ত্রণ জানালে অবশ্যই লেখা দিয়ে থাকি। সত্যি কথা বলতে কি বেশীরভাগ পাঠকের কাছে পৌঁছনোর মত পত্রিকা বিশেষ নেই। বাণিজ্যিক পত্রিকা যে কটি আছে সেখানে গল্পের মান এমন জায়গায় পৌঁছেছে, সেই মানের গল্প লিখতে পারব না।সেখানেও একটি লেখা প্রকাশিত হবার পর দু,তিন বছর আর সেখানে সেই লেখকের লেখা ছাপা হয় না। দু’হাজার সতেরো সালে দেশ পত্রিকায় অজ্ঞাপিত নামে একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল, গল্পটি আমার বেশ পছন্দের, কিন্তু বাংলাদেশের এক পাঠক গল্পটিকে সাম্প্রদায়িক গল্প বলে অভিযোগ করে একটি চিঠি লেখেন, তার তলায় দেশ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী ক্ষমা চেয়ে নেন গল্পটি অনবধানতায় ছাপা হয়েছে বলে। পরবর্তী সংখ্যায় গল্পটির সপক্ষে এবং ওই চিঠিটির প্রতিবাদে পাঁচটি চিঠি প্রকাশিত হয়,তার মধ্যে আমারও একটি চিঠি ছিল যেটি এডিট করে ছাপা হয়েছিল। তারপর থেকে দেশ পত্রিকা আমার কোন গল্প ছাপে না।সম্ভবতঃ আমি ব্লক। এখনকার সম্পাদক মন্ডলী সাহিত্য অপেক্ষায় বানিজ্যটাই বেশী বোঝেন তাই দেশ পত্রিকার পাঠক ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে। এখনকার দেশ পত্রিকার মান পূর্বের ছায়া মাত্র।


অমিতাভ: গল্পে প্লট না চরিত্র না কাহিনি-- কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেন ?

সুব্রত: গল্পের প্লট না চরিত্র না কাহিনী গুরুত্বের কথা যদি বলতে হয় সেটা গল্পের দাবী মেনেই তা হয়ে থাকে। লেখার সময় সেটা মাথায় থাকে না কোনটা বেশী গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে যাই হোক না কেন গল্প থাকতেই হবে এটা আমার মত। অনেকে সারা বিশ্বের গল্পের উদাহরণ টেনে আনেন, আমি আমার দেশীয় সাহিত্যই সব পড়তে পারলাম না। দেশ সমাজের পক্ষে যা গ্রহণযোগ্য সেরকম লেখার কথাই ভাবি। যা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না সেরকম প্লট, কাহিনী,বা চরিত্র আমার গল্পে গুরুত্ব পায় না ।


অমিতাভ: এতদিন ধরে লিখছেন । বইয়ের সংখ্যা মাত্র ২টি ।এর নেপথ্য কারণ কী ?

সুব্রত: সিরিয়াসলি লেখালিখি আমি খুব বেশী দিন করছি না, আমি জনপ্রিয় বা নামী লেখক নই, দুটি বই’ই যথেষ্ট মনে হয়। কোন প্রকাশক যেচে আমার বই ছাপবেন না তা আমি যতই ভাল লিখিনা কেন। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বই করার পর দেখা যায় প্রকাশক সেই বই’এর প্রতি বিন্দু মাত্র উৎসাহ দেখাচ্ছেন না, তীব্র অনীহা। খুব তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে বই প্রকাশ করে। এবং অপরাহ্ণে পত্রলেখা প্রকাশন এবং আমার বিষণ্ণ দুপুর কৃষ্ণসীস প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে। উপন্যাসটি কৃষ্ণসীস ‘এর পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল, অনেকেই প্রশংসাসূচক চিঠিও লিখেছিলেন কৃষ্ণসীস পত্রিকায়।প্রকাশকই বই করার প্রস্তাব দিয়েছিলেনএবং লেখকের খরচ তিনি তুলে দেবেন বলে আশ্বাসো দিয়েছিলেন, পরে আর কোন যোগাযোগ তিনি রাখেন না। বর্ধমান জেলা লাইব্রেরী সংখ্যা কিছু কম নয়, তারা জেলার প্রকাশকদের কাছ থেকে বই কেনেন। প্রকাশক বিভিন্ন বইমেলায় যান। নিজের একটি বড় স্টল আছে। এটাও কখনো জানান না যে আপনার এক কপি বইও বিক্রি হয়নি। নিজের বই নিজেই বিক্রী করার উদ্যোগ নেওয়ার মত শক্তি সামর্থ্য কোনটাই নেই, উপরন্তু বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর এবং লজ্জার। এতকিছুর পর বই করার পর যদি মনে হয় আমি ঠকে গেছি, তাহলে কেন দ্বিতীয় বার সেই পথে হাঁটব।


অমিতাভ: ইদানীং কালে খুব থ্রিলার লেখা হচ্ছে-- এ ব্যাপারে আপনার কী মত ?

সুব্রত: থ্রিলার আমি কখনো লিখিনি, ২০০৭ তিতির (কুচবিহার মাথাভাঙ্গা থেকে প্রকাশিত) একটি গল্পসংখ্যা করে, তার আমন্ত্রিত সম্পাদক ছিলাম, বিভিন্ন ধরনের গল্পের সংকলন করা হয়েছিল, সেই সংখ্যা আমি একটি গোয়েন্দা গল্প লিখি।গোয়েন্দা গল্প এবং থ্রিলার লেখার একটি অসুবিধা এগুলির কোন repeat value নেই। একবার জানা হয়ে গেলে আগ্রহ ফুরিয়ে যায়। তাছাড়া এই গল্পগুলিকে বিদগ্ধরা উচ্চমানের সাহিত্য হিসাবে মূল্য দেন না। লেখক বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে যান। যার জন্যে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতন লেখককেও বাংলা সাহিত্যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একাসনে বসাতে কুন্ঠিত হন সমালোচকরা।



*** সাক্ষাৎকারটি অবগুণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত ।

Comments


bottom of page