ধারাবাহিক গদ্য ❑ কবিতার কথা
- Sutarang Prakashana

- Jul 23, 2020
- 63 min read
Updated: Sep 14, 2020

প্রদীপ চক্রবর্তী
নব্বই দশকের কবি । জন্ম ১৯৭১ এর ১১ই ফেব্রয়ারি , কলকাতায় । যদিও বাবার কর্মসূত্রে , ছোটবেলা থেকেই শিল্পশহর দুর্গাপুরে । শিল্পশহরের প্রাকৃতিক পরিবেশ দামোদর নদ শাল সেগুন ছাতিম মহুয়ার আরণ্যক প্রেক্ষাপটে কলকারখানার পাশে জঙ্গল ও হাজারো পাখির শব্দে জীবনের পাঠ নেওয়া । বর্তমানে একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা । সেই দূর্গাপুর শহর , যেখানে একসময় অল্প সাহিত্য না সাহিত্য তিক্ত সাহিত্য , বাংলা ভাষার নিম সাহিত্যআন্দোলনের সূচনা , সত্তর দশকে । লেখালিখি শুরুর সময় নিমসাহিত্যের লেখককুল , সুধাংশু সেন , মৃণাল বণিক , বিমান চট্টোপাধ্যায় এবং পরে রবীন্দ্র গুহ' র সঙ্গে নিবিড় ও অন্তরঙ্গ যোগাযোগ । নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু করেন , স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায় ও সঞ্জয় রক্ষিতকে নিয়ে " কুরুক্ষেত্র " পত্রিকার সম্পাদনা । নয়ের দশকের মাখমাঝি সময় থেকে দুহাজার চার পর্যন্ত নিয়মিত কুরুক্ষেত্র পত্রিকা প্রকাশিত হয় । বাংলাসাহিত্যের প্রায় সমস্ত বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার একসময় কুরুক্ষেত্রে লিখতেন । পরে প্রায় দশ বছর বন্ধ থাকার পর , আবার কুরুক্ষেত্র পত্রিকা বেরোতে থাকে , বাৎসরিক হিসেবে । প্রদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে এবার যৌথ সম্পাদনায় আসেন , শূন্য দশকের কবি , সব্যসাচী হাজরা । প্রদীপ চক্রবর্তীর নব্বই দশক ও পরের লেখালেখি নিয়ে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় , দুহাজার পাঁচে । কবিতা বইয়ের নাম ," রেনবো গ্যালারিনী " । এই বইটির পরিবেশক ছিলো , পুস্তক বিপনী । এর পরে একে একে , " ছাতিম হরবোলা " ( কৌরব প্রকাশনী ) , সুফী রঙ (নতুন কবিতা প্রকাশনী), নয় আঁকা শূন্য (যৌথ / সব্যসাচী হাজরার সঙ্গে / অ্যাসট্রে প্রকাশনী ) , অব্যবহৃত প্রজাপতিগুলো (ত্রিশস্টুপ প্রকাশনী) , এবং এখনো পর্যন্ত সর্বশেষ কবিতার বই , জলের খোলাম (সুতরাং) থেকে প্রকাশিত । গদ্যের বই , স্বপ্নের জেহাদি ও অন্যান্য গদ্য । প্রকাশিত হয় , প্রান্তর প্রকাশনী থেকে । পরে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় , সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী থেকে । ভিন্নমুখ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত । বাংলা / হিন্দি ও ইংরেজিতে অনেক কবিতা অনূদিত হয়েছে এই কবির । পোস্টমর্ডার্ন বাংলা কবিতা সংকলন, প্রভাত চৌধুরী সম্পাদিত এই বইটিতেও ওনার কবিতা আছে । এছাড়া সমীর রায়চৌধুরী ও ধীমান চক্রবর্তী সম্পাদিত ইংরেজি পোস্টমডার্ন কবিতা সংকলনেও ওনার কবিতা আছে । লেখালিখি নিয়মিত শুরু হয়েছিল, কবিতা ক্যাম্পাস এবং কৌরব পত্রিকার হাত ধরে । এছাড়া আলাপ, কবিতা পাক্ষিক, কবি সম্মেলন, এখন বাংলা কবিতা পত্রিকা , নতুন কবিতা , চিত্রক , কবিতা আশ্রম সহ অনেক লিটল ম্যাগ বা অনলাইন বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগে নিয়মিত লেখালিখি করেন । তাঁর অন্যতম প্রধান শখ, পুরোনো বাংলা ও হিন্দি গান শোনা ও গানের সংগ্রহ । সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন । নানারকম সিনে ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন একসময় । একসময় নিয়মিত দুর্গাপুরে, আন্তর্জাতিক সিনেমা উৎসবের আয়োজকদের মধ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন ।
© প্রদীপ চক্রবর্তী
❑ কবিতার কথা: এক ❑
আমার প্রথম কবিতার বই, রেনবো গ্যালারিনী । পুস্তক বিপনী থেকে বইটি প্রকাশিত । যদিও এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, দুহাজার পাঁচে । কিন্তু এই বইয়ের লেখাগুলো 1994 থেকে 2004 এর মধ্যে । মূলত নব্বই দশকের লেখালিখি থেকেই এই বইটি' র প্রায় সব কবিতা নেওয়া হয়েছে, পরের চার বছর থেকে খুব কম ই লেখা নেওয়া হয়েছে । এই বইয়ের প্রথম কবিতাটি লেখা হয়েছে উনিশশো পঁচানব্বই সালে ।
ঠিক পঁচিশ বছর আগে লেখা এই কবিতাটি...কিছুই প্রায় জানতাম না তখন কবিতা নিয়ে...যদিও এতো বছর পরেও কবিতা নিয়ে কিছুই প্রায় জানি না...কবিতাটি দিচ্ছি এখানে...
জন্মদিনের
ঢেলে ছড়ানো সুন্দরম
কে প্রথম অনিল ভর্তি পঙ্খী বানালো
ছলাৎ লেগেছিলোয় লালী
দূরে পাওয়া জলের ভেতর থেকে আলোপাতের
আকণ্ঠ বানান
ধুবুলিয়া সেক্টরে ফোটে একমাথা
ডাকের দিনে ডাকশন দাও
মনীশের দলাপাকানো ঘষা কাচ
আনমোল হয়ে গেলো
লাফিং ক্লাবে হেসে আসা
পলিতরোদের ছায়ারাখা প্রস্তাব
নতুন তামাম পড়ে কুসুভোলোকিত
পালঘাট বলে না সিগামাইন্
আলতো নিলাম বোলে
কুয়াশাজোড়ে পাঠানো
যেখানে পাথর বাংলোয়
টুরিস্টব্যূরোর গন্ধ যাচ্ছে ঘন্টামাফিক...
মনে পড়ে বাল্যবন্ধু মনীশের কথা । ডাকনাম টুটুল ।
ওর এক বিচিত্র শখ ছিলো । কাছাকাছি একটি কাচ কারখানায় কাজ করতো ওর বাবা । নানারকম রঙিন পরিত্যক্ত কাচ ওর অদ্ভুত শখ মেটানোর জন্যে ওর বাবা নিয়ে আসতেন । মনীশ ওরফে টুটুল, সেই ভাঙা কাচগুলোকে নিয়ে ঘসাঘসি করে নানারকম আকৃতি দিয়ে ও অদ্ভুত চশমা তৈরী করতো । উদ্দেশ্য রঙিন কাচের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীকে দেখা । ওর এই বিচিত্র ছেলেমানুষির দোসর ছিলাম আমিও । আমিও ওর কাচের মধ্যে দিয়ে দেখতাম পৃথিবীর নানারকম রঙ বৈচিত্র...
কৈশোরের চোখ যা দেখে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হারায় সেই দেখার চোখ । এই সুন্দর এই গভীর পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ স্পর্শ আমি ও অনুভব করতাম সেই ছেলে মানুষীর চোখ দিয়ে । ব্যপারটা হয়তো আদ্যন্ত হাস্যকর কিন্তু সেই সময় আমাদের কাছে ব্যপারটা ছিলো গভীর আনন্দের ।
সেই ডান্ডাগুলি, লাঠি দিয়ে টায়ার ছোটানো, লুকোচুরি,গোল্লাছুট, ডেগ্গুল, হুসহুস, গোবর লাঠি, ঘুড়ি ওড়ানো এবং তারজন্য সুতোর মাঞ্জা তৈরির যে অভুতপূর্ব প্রস্তুতি, বুড়ির সুতোর পেছনে ছোটা...এরকম সব খেলা । সত্তরে জাতক যে কোনো কিশোরের অনুভূতিতে আজও আছে এসব খেলার উদাহরণ । আজগের এই চূড়ান্ত ব্যস্ত পৃথিবীর কিশোর, আর কোনোদিন কৈশোরের এই রোমাঞ্চকর স্বাদ আর পাবে না কখনও ! পৃথিবী বদলে গেছে...
এই ঢেলে ছড়ানো সুন্দরমের খোঁজেই ব্যস্ত থাকতো সেদিনের যাবতীয় প্রতিযোগিতার বাইরে থাকা কিশোরেরা...
মনীশের সেই ঘষা কাচ একদিন হারিয়ে গেলো জীবন থেকে । কিছুদিনের যক্ষারোগে সে তার বাবাকে হারালো । আর স্বামী হারা তার মা, তাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে চলে গেলো দূরের মামার বাড়িতে...
মনীশের সঙ্গে আর দেখা হয় নি আমার । কিন্তু শুনেছি, বেশ কিছুবছর পর মনীশ নিরুদ্দেশ হয়ে যায় হঠাৎ...কেন কি কারণ আজও অজানা আমার কাছে...!
আমরা যেখানে খেলতাম সেই জায়গার কাছে একটা বিরাট পরিত্যক্ত বাংলো বাড়ি ছিলো । শুনেছি পঞ্চাশ দশকে যখন দুর্গাপুর শিল্পশহরে রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন রাশিয়ান কিছু ইঞ্জিনিয়ার ওই বাংলোয় থাকতেন । পরে, তাঁরাও চলে যান কাজ শেষে । আস্তে আস্তে বাড়িটি, একা হয়ে পরে । প্রচুর গাছ আর লতানো জঙ্গল কীট পতঙ্গ ভাম শেয়াল পাখি এসব নিয়ে বাড়িটি বেশ নিজস্ব ভাবমূর্তি নিয়ে বহাল তবিয়তেই ছিলো । কিন্তু মানুষ ও তার সভ্যতা এতটা স্বাধীনতা দেবার ব্যাপারে উদার ছিলো না । বাড়িটিকে পরে ভেঙে একটি ট্যুরিস্ট অফিস হয়ে যায় । বাড়িটির নাম মুখে মুখে ঘুরতো পাথর বাংলো বলে...
কালের নিয়মে সবই হারায়...
কেবল স্মৃতির শহর বেঁচে থাকে শৈশব নিয়ে মনের গভীরে...
যখন লিখেছিলাম তখন নব্বই দশক । আবহমান বাংলাকবিতার অধিকাংশ কবি দাপুটে দক্ষতায় ছন্দের খেলায় কবিতাকে নিয়ে যাচ্ছিলো কোনো এক উচ্চতায় । সমকালীন নব্বই দশকের বন্ধুদের ভাষা আমি পাই নি কবিতায়...তাই এভাবেই লেখা হয়ে গিয়েছিলো এই প্রথম কবিতা বইয়ের প্রথম লেখাটি । কোনো তত্ব নয়, কোনো দীক্ষিত মন্ত্র নয়, আমার জীবনের ভেতর থেকে এই কবিতার বিমূর্ত প্রাণ এই ভাষাকেই বেছে নিয়েছিল...
(ছবিটি আমার তোলা কিছুদিন আগে । মাইথনে...তবে স্কুলের দিনগুলোতে কখনও কখনও গেছি পিকনিক করতে এই ড্যামে...মনে পড়ে সেই সব দিন)

❑ কবিতার কথা: দুই ❑
যুগ আতে হ্যায় ঔর যুগ জায়ে
ছোটি ছোটি ইয়াদোকে
পল নহি জায়ে
ছুট সে কালি লাগে
লাগে কালি রাতিয়া
রুঠি হুয়ি আঁখিও নে
লাখ মানায়ই রহে না
বিতি না বিতায়ি রয়না
বিরহা কি জায়ি রয়না
ভিগি হুয়ি আঁখিওনে
লাখ বুঝায়ই রাহেনা...
দৃশ্য -- এক
ভুলভাল বানানে গুলজার সাহেবের লেখা যে গানটি এখানে লিখলাম আর পঞ্চম দা র সুরে, সেই সত্তর দশকে "পরিচয়" সিনেমাটি' র সেই অমোঘ দৃশ্য । মেয়ে জয়া ভাদুড়ী (বচ্চন) বাবা সঞ্জীব কুমার । অসুস্থ ব্যর্থ গায়ক বাবা । ক্ষয়রোগ বাসা বেঁধেছে । তবু মেয়ের গান শুনে, সিঁড়িবেয়ে নামতে নামতে বাবা ভূপিন্দর সিংহের কণ্ঠে লিফ দিচ্ছেন এই গানে । পুরোটা শেষ করতে পারেন না । কাশির দমকে দমকে থেমে যান । চোখের কোণে চিকচিক করে জল । মেয়ে পরমযত্নে হাসি মুখে বাবার মুখ মুছিয়ে, গানটি উত্তরাধিকার সূত্রে গাইতে থাকে । তাদের সুখের অতীত মনে পড়ে । মনে পড়ে মায়ের কথা । সেই গল্পই শোনায় মেয়েটি, পরিবারের কয়েকটি দস্যি বাচ্চাকে পড়ানোর জন্যে আসা, জিতেন্দ্রকে । স্তব্ধ চোখে, নির্বাক ভাষায় এই গল্পের সমব্যথী হয় সে...
দৃশ্য -- দুই
আমার গান পাগল বাবা, যিনি দুহাজার সতেরো সালে আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন । যিনি আমার বন্ধু, প্রিয়, অভিভাবক, অনুভূতির শিক্ষাগুরু । সেই মানুষটির কাছে শুনেছি, ছোটো বেলায় যখন অতটা বুঝতাম না, তখন দুরন্ত আমাকে থামাবার জন্যে ছয় ব্যাটারির ফিলিপ্স রেডিওতে (বাবার বিয়ের উপহার !) আমাকে প্রায় ধরে বেঁধে (আক্ষরিক অর্থেই) বসিয়ে গান শোনানো হতো । অল ইন্ডিয়া রেডিও, বিনাকা গীতমালা, বিবিধ ভারতী, কলকাতা ক এর দুপুরের অনুরোধের আসর । আর অদ্ভুত ভাবে অনেক গানের মধ্যে কখনও যদি এই গানটা রেডিয়োয় বাজতো, আমি চুপ করে যেতাম । খেতে খেতে খাওয়া থামিয়ে দিতাম । আর হু হু করে বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যেত । চোখ ভিজে যেত জলে । তখন ব্যথার উৎস বুঝতাম না । আজও বুঝি না । কেবল অকারণ এক সুন্দর গভীর নির্লিপ্ত উদাস করা দুপুরের খাঁ খাঁ নির্জনতার মতো ব্যথা এসে বুকের ভেতরটাকে উস্কে দিতো । এতো ভালবাসতে ইচ্ছে করতো না, যে কি করি মাকে জড়িয়ে ধরি, পুরো নিশ্বাস খরচ করে আঁচলের গন্ধ নি । আর বাবা যখন গান গেয়ে ঘুম পাড়াতো তাঁর এই একমাত্র অকাল কুস্মান্ড পুত্রকে, তখন বাবার বিশাল বুকের কালো কালো রোমের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে ঘুমিয়ে পড়তাম ।
আসলে সে দিন বুঝি নি, আজ বুঝি এই হতাশ, করুণ, জটিল, নির্মম, কাঙালের মতো ভালোবাসা চেয়েও জীবনের কাছে না পেয়ে যখন. আমার মতো অনেকেই দুঃস্বপ্নের আতঙ্কে একটু একটু মনের ভেতরে তলিয়ে যেত, তখন এভাবেই নেপথ্য থেকে ঘুম পাড়াতেন এক গানের যাদুকর । তিনি পঞ্চম দা...তিনি রাহুল...তিনি বহু মানুষকে অবসাদ আর আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছেন এবং শেষে এই জিনিয়াসকেও কাজের অভাবে, ফ্রাস্টেটেড হতে হয়েছে এবং যখন আবার সমস্ত শক্তি নিয়ে বিধু বিনোদ চোপড়ার (1942 a love story) তে ফিরে আসছেন, তখন সফলতা দেখার আগেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, যেখানে স্বর্গীয় সংগীত হিসেবে বাজানো হয়...
" মুসাফির হু ইয়ারো
না ঘর হ্যায় না ঠিকানা
মুঝে চলতে যানা হ্যায়
বস চলতে যানা..."
এই মানুষটার কাল জন্মদিন ছিলো, একাশিতম...
জন্ম 27 জুন, 1939, কলকাতা
মৃত্যু 4 জানুয়ারি 1994...
পড়াশুনো এই বাংলায়...
বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাইস্কুল
এবং, তীর্থপতি ইনস্টিটিউশন...
বাবা শচীন দেববর্মন মা মীরা দেববর্মন
পঞ্চম দা র প্রথম স্ত্রী, রীতা প্যাটেল
পরে আশা তাই, আশা জী, সাক্ষাৎ মা সরস্বতী আশা ভোঁসলে...
কিন্তু হাজার লাখো গল্প আছে পঞ্চম দা কে নিয়ে...
আজ তা নয়
আজ আমার কবিতায় তাঁর প্রভাব....
দৃশ্য --- তিন
এটুকু আমি জানি, আমার এই জীবনে গান না থাকলে কবেই আমি নিজেকে কুইট করে নিতাম এই নিতান্ত অপরিচিত পৃথিবী থেকে...
আর পঞ্চম দা না থাকলে আমি কবিতাই লিখতাম না...
আসলে যেদিন প্রচন্ড মনের ঝাড় খেয়ে, নাড়া ঘাটা হয়ে লিখতে বসেছি, সেদিনই তীব্র নেশার মতো লেখার আগে প্রিয় ও মন মেধা এবং ভাবনার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী দু চারটে বাছাই গান শুনে নিয়েছি । তারপর একসময় নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়েছি খাতার ওপর । সঙ্গমের সময় যখন চূড়ান্ত মুহূর্তে, উত্তুঙ্গ অবস্থায় সব নির্যাস বেরোনোর শূন্যতায় মন যখন অসীম শূন্য হয়ে পেঁজা তুলোর বরফ হয়ে হিমালয়ের নির্জন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়...ঠিক তেমনই লেখা হয়ে যায়...
সেই আনন্দেই...
আবার রক্তে ভোঁসলে
হইয়াহো
মানা যায় এ -- রকম
উফ হচ্ছে, গান হচ্ছে, শব্দ হচ্ছে
শচীন কর্তাও আধো পলকে
ওড়না ওড়ে জলের কাছে
ডোরা কাটা
ছায়া দোলে ছায়া কিশোর লাগা পাইন
ছায়া ছেঁড়া
ব্যাগে ব্যাগে, ছায়া ও ছায়ার
শান্ত ককপিটে কফি হাতে মনিকা
তাহলে, তাহলে কি বুঝতে হবে
চিরকুট এলো আবার আবারো
তবুও অন্ধকার হলো না, চাঁদ উঠলো না
গানও, নয় আমাকে পেরোলাম, পেরোলাম...
একটু কেঁপে ওঠা কুয়াশায় বানানো
গ্রামোফোন কুকুরের মুখ... (পঞ্চম দা)
দৃশ্য --- চার
চাঁদ যখন এলো, তখন ওই সংলাপ মনে এসে যায়...
এ জো ফুলো কি বেলে নজর আতি হ্যায় দরসল ইয়ে বেলে নহি হ্যায়
আরবি মে আয়তি লিখখি হ্যায়, ইসে দিল কে বকত দেখনে চায়ি হ্যায়, বিলকুল সাফ নজর আ তি হ্যায়, দিনকে ওয়াক্ত ইয়ে সারা পানি ভরি রহতি হ্যায়...
সঞ্জীব কুমারের এই কথায় আঁধি ছবিতে সুচিত্রা সেন বলছেন- আপ ক্যায়া কহতি হ্যায়...কাহা আ পায়ুঙ্গি ম্যায় দিন মে?
সঞ্জীব কুমার --- এ জো চাঁদ হ্যায় না ইয়ে রাত মে দেখ না, ইয়ে দিন মে নহি নিকালতা
সুচিত্রা --- এ তো রোজ নিকালতে হোগা
সঞ্জীব -- হ্যাঁ... লেকিন বিচ মে অমাবস আ যাতি হ্যায়... ও সে তো অমাবস পনের দিন কো হোতি হ্যায়, লেকিন ইসবার বহুত লম্বি থি
সুচিত্রা --- ন বরস লম্বি থি না... ( গুলজার সাহেবের লেখা এই সংলাপ ভুলভাল বানানে লিখলাম, তবে ব্যাপারটা এই / এই দীর্ঘ অদর্শনের পর পরিণত বয়সে মনের অপেক্ষা এবং আকুলতা )
তো এভাবেই এই সব সংলাপ আর...তেরে বিনা জিন্দেগী সে কোই সিকোয়া তো নহি... অমোঘ পঞ্চমের সুরে কিশোর কুমার ও লতাজির সেই গান...
কিন্তু লেখা হয়ে যায় অন্য একটি কবিতা আমার...
কোমল ও বৃন্দা
অভিলাষী পাঠ্যের দাগ
কখনো উত্তরপাখির ছোটো ছোটো শিস
কুরে খায় কতখানি খাদ
তোমার শিউলি স্নানের শীত বিকশিত
জলের কাঙাল সীমায়
ন বরস লম্বি থি না
ও চাঁদ...
অথচ তুমি আলিশায় একা...
জলভর্তি কাপ আর জুঁই লতার পাশে
এখনো রয়েছে করমচার লালা
কামিনী বাহার
মিহিবুননের কোমল খাপি
স্ববিরোধী গন্ধে নিষিদ্ধ দাঁতের শাসন
ফলে একটা দাগ রেখে গেছে...
এর কতো টুকু স্বপ্নে অনারোগ্য
অন্তরীপে শূন্যতার কোষাগার
কিংবা নাওডুবি, পাড়ের বৈচিত্রে...
শ্যামলী পিরহানে থানের গন্ধ
শরীর থেকে আলগা পড়ে যায়,
তার পাখি পাক খায়
অবৈধ আনন্দে বশীক্ষরণের ব্র্যান্ডভ্যালু
টের পাই পটুয়া আর্ত,
মনলাগা বিষের ইতরে
সুহৃদ হাঁসের জলে
বারে বারে ব্যর্থ হতে হয়...
সে এক কমল ঝরিয়া গাইছে
গাইছে, তেরে বিনা জিন্দেগী ভি লেকিন জিন্দেগী...
ন বরস লম্বি থি না... (দেহসাধকের খিদে)
এভাবেই কতো না পথে পঞ্চম দা আমাকে দিয়ে প্রত্যক্ষ - পরোক্ষ ভাবে কবিতা লিখিয়েছেন...
ইজাজৎ ছবিতে গুলজার সাহেবের লেখা সেই গানের কথায় অম্লমধুর বন্ধুত্বের নিমরাজি খুনসুটিতে, পঞ্চম যখন বলেন গুল্লু প্রিয় গুলজারকে... এবার থেকে খবরের কাগজ থেকে খবর নিয়ে এসে আমাকে সুর দিতে বল...কিন্তু শেষে সেই কথার ওপর দাঁড়িয়ে পঞ্চম দা অবিস্মরণীয় সুর দেন, সেই গান...
অনুরাধা প্যাটেলের লিপে আশা তাই এর...
" মেরা কুচ সামান
তুমহারে পাস্ পড়া হ্যায়
ও শাওন কে কুছ ভিগে ভিগে রাখখে হ্যায়
ঔর মেরে ইক খত মে লিপ্টি রাত পড়ি হ্যায়
ও রাত বুঝা দো
মেরা ও সামান লওটা দো...
এ গান থেকেও এসেছে কবিতা...
কিন্তু সে আরেকদিন...
(এখানে আমার প্রথম বই, রেনবো গ্যালারিনী থেকে, পঞ্চম দা কবিতাটি এবং ছাতিম. হরবোলা থেকে দেহসাধকের খিদে কবিতাটি নিয়েছি)
ছবির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, পঞ্চম দা, গুলজার সাহেব এবং আশা তাই এর ছবি, গান তোলানো হচ্ছে...মেরে কুচ সামান গানটি...
এই অবিস্মরণীয় ছবিটির ক্ষেত্রে আমি আর ডি বর্মনের পেজ এর কাছে সীমাহীন কৃতজ্ঞতা জানাই...

❑ কবিতার কথা: তিন ❑
আজ সারাদিন বৃষ্টি...আজ সারাদিন রেনি ডে...
গত কয়েকমাস গৃহবন্দী জীবনে বাধ্যত ঘরের চারদেয়ালে মাথা খুঁড়ে মরছি, আতংকিত বড়ো কষ্টের এই গৃহবন্দী দশা । সবার । এতো ছুটি নয়, আতঙ্কের উৎপীড়ণ! তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে...বলার মতো অবস্থা নয়, তবু চিরকালই বর্ষার গন্ধে আমি উতল হয়ে উঠি । আমার সমস্ত লেখালিখি জুড়ে বর্ষার আমন্ত্রণ । বৃষ্টি কার্যত আমাকে ধুয়ে মুছে উদাসী করে দেয় । মন চলে যায় দূরের ঠিকানায় । আমার জীবনে রেনি ডে ফুরিয়ে গেছে সেই শৈশবে, স্কুলের দিনগুলোতে । তবু কবে যেন লিখেছিলাম...
“পলাশ বনে তসরের গুটি । পথভারী, ছায়া ভাঙ ছায়া ভাঙ নীল । বনের বর্ষা যেতে যেতে কাঠবিড়ালি হয়ে গেছে..."
বা
“ভেজা নারী এবং পথ । একটি ইন্দ্রিয় কাঁথার অন্ধকার । মৃদু খুলে গেলো, বন্ধ হচ্ছে আর থেকে থেকে ক্ষত চলে গেছে । তাকে ডেকে আনা স্থপতির কাজ”
বা
বৃষ্টি পড়ছে । অন্ধকার হয়ে থাকার কাছে মেয়েটি গ্রাম -- রঙ মাখা
এই বাদলায় যেন রক্ত নেই...মাংস নেই...শ্রবণ ঝিল্লি নেই
বৃষ্টির মধ্যে কেউ না কেউ কুড়িয়ে পেয়েছিলো তাকে
কিংবা ফেরত দিচ্ছে রঙভঙ্গী । অনবরত অসম্মতির দমকা হাওয়া
ফোঁটা ফোঁটা ঘাম । কপালে এবং কীভাবে মদির,
জলোয়া...
অতল নৈশ ময়ূর,
তার ভগ্নাবশেষ মেলে মাথা তুললো ফের...
এভাবেই এসে যায় । এসে গেছে । মনে পড়ে স্কুলে কলেজে আকুল অজানা এক ব্যথা মনকে তোলপাড় করে দিতো বৃষ্টি এলে । ইনল্যান্ড লেটার, পনেরো পয়সার পোস্টকার্ড আর খামগুলো ভরে যেত আমার মানস প্রেমিকাকে লেখা বড়ো বড়ো চিঠিতে, কিন্তু সে চিঠি কোনোদিনও পোস্ট করা হয় নি । এমনকি বন্ধুদের প্রেমপত্র বেশ জমিয়ে লিখে দিতাম । দুএকজন সফল প্রেমিক এই চিঠি পেয়ে আমাকে আবেগী প্রশংসায় ভরিয়ে দিতো । আসলে ওরা জানতো না, এই চিঠিপত্রগুলো লিখিয়ে নিতেন আমাকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়...
আশির দশকে শেষে বেশ কয়েকবারের পর আরো একবার হেমন্ত বাবু আমাদের শিল্পশহরে এসেছিলেন গান গাইতে । তিনি তখন গুরুতর অসুস্থ । প্রায় ধরে তাঁকে স্টেজে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে । শীর্ণকায় হয়ে গেছেন । ওই জলদগম্ভীর ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠের জোয়ার কেমন যেন কেঁপে কেঁপে যায় হাফ টানে । তবু রয়েল বেঙ্গল রয়েল বেঙ্গলই । কারণ হেমন্ত মুখো পাধ্যায়, এই বাংলার সেই প্রথম আদ্যন্ত পেশাদারি শিল্পী, যিনি পনেরোটি গান এক ঘন্টার মধ্যে স্টেজে শেষ করতে পারতেন । এতো নিখুঁত সময় জ্ঞান ভাবা যায় না । কোনো গান তিন মিনিটের হলে, তিন মিনিটেই থামতেন । সাড়ে তিন মিনিট হতো না...!
তো সেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি যে গানটি দিয়ে আসর শেষ করলেন, এবং সেই শেষ । তারপর বাংলাদেশে যান । ফিরে এসে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা যান । সেই সময় স্টেজে তাঁকে একটি বড়ো চেয়ারে বসিয়ে বাহকগণ নিয়ে আসতেন । কিন্তু তিনি ছিলেন সব অর্থেই জনগণের গায়ক । মানুষের স্বপ্নের সওদাগর ।
তো শেষ গানটি কি ছিলো? ...
"ওগো মেঘ তুমি উড়ে যাও কোন ঠিকানায়
কে তোমায় নিয়ে যায় দূর অজানায়
বলো না আমায় ওগো মেঘ...
আমি নই সেই বিরহী আমার কাউকে বলার কিছু নেই
তবু যেন কী বেদনা জমে ওঠে হৃদয়ে
মনে হয় আমার কেউ কেন নেই
ওই অলকায়
ওগো মেঘ...
তবু আজ এ লগনে তোমায় একটি বারতা জানালাম
ব্যথা যদি নাই পাই এ জীবনে কি পেলাম
সেই প্রেম কেন নেই
যে এসে আমার মনকে কাঁদায়
ওগো মেঘ তুমি উড়ে যাও কোন ঠিকানায়..."
এ গান এ জীবনে পঞ্চাশবার শুনেছি । এবং এ
গানই আমার জীবনের, অনুভবের প্রতিভাষ্য ।
কারণ সেভাবে ব্যথা পেলেও কোনো মানুষী এ জীবনে আমাকে সেই ব্যথা দিতে পারে নি । প্রেম এমন এক একক তীব্র অনুভূতি যা বস্তুকে স্পর্শ করে উড়ে যায় অজানা মেঘের মতো । যেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো চাওয়া নেই, পাওয়া নেই, বিনিময় নেই, শরীর মন বা বিষয়ী আবেদন নেই । এমন এক একক ব্যথা যা পেতে ভালো লাগে কিন্তু কেউ সেভাবে দিতে পারে না...
আমার বাবা সারাজীবন মনে মনে ভালোবেসে পুজো করে গেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে । তিনি ছিলেন শখের গায়ক । আমি তাঁর একান্ত শ্রোতা ও বন্ধু । নির্জন বর্ষা ভেজা রাতে কড়া চারমিনারের গন্ধে যখন রাত অচেনা হয়ে যেত, ঠিক তখনই বাবা নিজেকে শুনিয়ে জানলার বাইরে ওই ঘুমন্ত জগৎ বাড়ির দিকে তাকিয়ে গাইতেন, এই গান বা
"যদি জানতে চাও তুমি এ ব্যথা আমার কতটুকু
বন্দি করা কোনো পাখির কাছে জেনে নিও
বা
"বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা
দূর নীলিমায় ওঠে চাঁদ বাঁকা
একা একা পথ চেয়ে থাকা
ভালো কি লাগে”
বা
"সবাই চলে গেছে / শুধু একটি মাধবী তুমি / এখনো তো ঠিকই ফুটে আছো / কেন কতো আর / চেয়ে চেয়ে দেখে যাবে / আমার চোখের জলের একাকার / সবাই চলে গেছে”
বা
“ওগো যা পেয়েছি সেই টুকুতেই খুশী আমার মন / কেন একলা বসে হিসেব কষে / নিজেরে আর কাঁদাই অকারণ”
আসলে এ সবই অনির্দিষ্ট প্রেমের গান । এই মগ্ন প্রেমে ব্যথিত বিরহী আছে কিন্তু নেই রামগড়
অলোকাপুরী বা কোনো এক বিরহ যক্ষ ।
আমি অবিকল দেখতাম মানুষ যখন তাঁর আরাধ্যকে পুজো করে তখন আরাধ্য আর ভক্ত একাকার হয়ে যায় । বাবাও অবিকল হেমন্ত বাবুর কণ্ঠে নির্ভুল সুরে একা একা গেয়ে যেতেন । দু চোখ তাঁর ভিজে যেত শাওনের ধারায় । অথচ মানুষটা দিনের বেলায় অদ্ভুত ভাবে বদলে যেতেন । তখন কোনো সুর নেই কণ্ঠে । পুলিশের ডি আই বি তে কর্তব্যনিষ্ঠ একজন মেরুদাঁড়া সোজা করে চলা মানুষ । আসলে পূববাংলায় অতি শৈশবে বাবা মাকে হারিয়ে চলে এসে, মামার বাড়ির আশ্রয়ে মানুষ হয়ে ছিলেন তিনি । নিজের বাবা মাকে কেমন দেখতে ছিলো, জ্ঞানত তিনি জানতেন না । আমিও কোনো দিন ঠাকুর দা ঠাকুরমার ছবি দেখি নি...
যাইহোক এর পরের কথাটা বলে, একটি কবিতা দিয়ে শেষ করবো আমার লেখাটি ।
বাবা চাকরি সূত্রে অনেকবার অনেক মন্ত্রী গায়ক অভিনেতার সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন । স্বাভাবিক । আশির দশকে কাজের সূত্রে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের গেস্ট কার্ড পেতেন । আমরা মানে আমি আর মা প্রাণ ভরে অনেক কিংবদন্তি শিল্পীর স্টেজ প্রোগ্রাম দেখেছি । তো আমার একটা ছেলেবেলায় অটোগ্রাফের খাতা ছিলো, দুর্ভাগ্য পরে সেটি চুরি যায়, তো আমারও রক্তে হেমন্ত বাবু ছোটবয়স থেকেই মিশে গিয়েছিলেন । আশির শেষের দিকে সেই প্রোগ্রামের পর আমার খুব আবদার ছিলো হেমন্ত বাবুর একটি অটোগ্রাফ নেবার । বাবা শুনবে না আমিও নাছোড় । এমনিতেই বাবা ব্যক্তিগত মানুষ তার ওপর তাঁর আরাধ্যের অটোগ্রাফ তিনি নিতেই দেবেন না । কারণ এই প্রকৃতির মানুষ দূর থেকে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে যায়, কিন্তু কাছে যায় না । আমি নাছোড়বান্দা । অগত্যা, বাবা আমার চাপে নতি স্বীকার করে শেষে, নিমরাজি হলেন । এবং একসময় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো । এই অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা যিনি ছিলেন তিনি বাবার সবিশেষ পরিচিত ও বন্ধু । তাঁকে অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুষ্ঠানের শেষে বিদায়ী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন । হেমন্ত বাবু তখন দুর্গাপুর গেস্ট হাউসে উঠবেন । চারদিকে লোকে লোকারণ্য । ভিড়, ভক্ত, উন্মাদনা । মঞ্চের পেছনের গেট দিয়ে তিনি চলে যাচ্ছেন । বিশেষ অনুরোধে এই অতি সুভদ্র মানুষটি দাঁড়ালেন । প্রধান উদ্যোক্তা কানে কানে কিছু বলার জন্যই । এবং অবশেষে আমার ডাক পড়লো । আমার পা ঠকঠক করে কাঁপছে । চারদিকে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ । উনি মৃদু সুভদ্র কণ্ঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, " কই দাও তোমার খাতা "...
আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন...
এবং মুক্তোর মতো হাতের লেখায় শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়ে আমার নাম. লিখে, নীচে সই করলেন । সারাজীবন রেডিও, হাজার এক সিনেমায়, গ্রামোফোন রেকর্ডে যার গান শুনে আমি পাগল, তাঁকে এভাবে সামনে দেখে আমি ভাষাহারা । আমি সেই সুযোগে ওনার পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম । ওই বিশাল মহীরুহের মতো দীর্ঘকায় মানুষটি, আমাকে আলতো জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত রাখলেন । এক অদ্ভুত অমেয় গন্ধ পেলাম ওনার শরীর থেকে । ধুতি, হাতা গোটানো শার্ট, এবং সেই অবিস্মরণীয় এক গন্ধ...বিশ্বাস করুন এই গন্ধটি আমি আমার বাবার গা থেকে পেতাম সেই সমস্ত একাকী রাতগুলোতে যখন বাবা তন্ময় হয়ে একা একা গাইতেন তাঁর আরাধ্য দেবতার গান....
জন্মশতবর্ষ চলছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের । সেই অবিস্মরণীয় গান্ধারলোকের কিংবদন্তি শিল্পী আর একটাও এলো না পৃথিবীতে, আর আসবেও না । তিনি হেমন্ত, চির বসন্তের প্রতীক, তিনি বাঙালির শিকড়ে রক্তে মিশে আছেন এমনভাবে যার কোনো. পেটেন্ট হয় না...
শেষ করছি আরেকটা আমার বর্ষার কবিতা দিয়ে...
বৃষ্টি মিশেল...
দুপুরে রসুই গন্ধ
সেদিন কিছু অন্যরকমের বরখা...
তার মেঘলা মুহূর্ত পহর ঘ্রাণ
লাউপাতা মুড়ে নারকেল কোরা অল্প চিনি নুন হলুদ গুঁড়ো রাইসর্ষে ইলিশ যেন পোয়াতি পেটের সোহাগ মাখানো
শব্দে এটুকুই ধরতাই,
এটুকুই শাশ্বত বাসনা কুসুম
কেয়ূর চন্দন কিরণমত্ত তিমিরে গাঢ় স্বাদ -- বিলাসিনী
ফি রোববার দুপুরে তপন থিয়েটার কিংবা বিলকিস বেগম
কোথায় সেই হারানো মুহূর্ত শঙ্খলাগা
কাঙাল মালসাট?
আদবে ছলনাময়
প্রসাধনে দেহটি শোয়ানো ছিলো...
সেদিন বৃষ্টি মিশেল
পঞ্চশির নাগদেবতার শব্দ,
ব্রহ্ম নির্যাস
কলাই করা থালা থেকে একটু একটু চুমুক দিয়ে খাও
দেশ বলো নদী কিংবা গ্রাম...
লহমায় আজ ভিজিয়ে দেয়
অলৌকিক বৃষ্টি উৎসবে
গহ্বরে মিলিয়ে যায় স্বর, স্তব্ধ শ্বাস,
নিমেষের আদিখ্যেতা...
কুহুকিনী পটুবাক... বিনষ্ট বিষের লিবিডোকে
নাশকতায় বাজাবে না আর...
মৃদু অর্গানে বাজাবে না কেন?
❑ কবিতার কথা: চার ❑
মামা বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে এক হাড় ডিগডিগে ছেলে । পাখির আহার তার । বেশী দিলে বমি করে । বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র । পেটে কুচো কৃমি । মাঝে মাঝে কৃমির জ্বালায় অস্থির হলে, দিদিমা তাঁর ছোটো মেয়ের এই পোলাপানটিকে ন্যংটো করে কাঠি দিয়ে গুহ্যদ্বার দিয়ে কৃমি বের করে । তখন একটু শান্তি । তো সে, এতে চোখ বুজে সুড়সুড়ির আনন্দ পায় । তার সুখ মামা বাড়ির এই গ্রামে গেলে । আদিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতির ভেতর সে ছুটে ছুটে আনন্দ পায় । তো একদিন এই পুকুর পাড়ে বসে সদ্যজায়মান মাছের জটলায় একটি বড়ো শোল মাছের উদ্বেল খুশির ডিগবাজি দেখে তাকে ধরতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধায় । কখন সবার অজান্তে সে গড়িয়ে টুপ্ করে জলে পড়ে যায় । সে সাঁতার জানে না । কেবল কুহক নীল জলে জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে নীচে তলিয়ে যেতে থাকে ক্রমশ । যেন জন্মান্তরের অব্যক্ত দরজা খুলে নৈঃশব্দ্যের অতিপ্রাকৃতিক ত্রসরেণুদের মায়া নাচে সে কেবল ডুবে যায় যূথচারী কয়েকটি মাছের অন্তর্গত খেলায় । তার আর কিছু মনে থাকে না । পরে শুনতে পায়, তাকে ডুবতে দেখে কানাই বলে এক জন্ম বাউন্ডুলে মেছো যুবক, যে মামার বাড়িতে আশ্রিত, তাকে তুলে নিয়ে আসে কয়েক ফাৰ্লং মৃত্যুর দূরত্ব থেকে...
সেই দিন মৃতপ্রায় সেই শিশু অনেক প্রিয়জনের চোখের জল ও ভর্ৎসনা সহ্য করে উঠে আসার পর কেমন যেন আরো চুপচাপ অন্তর্মুখী হয়ে যায় । কেমন যেন অনাসক্ত, নিস্পৃহ, চিরম্লান, নির্লিপ্ত এবং একা...
সেই প্রথম সে মৃত্যুর অনপনেয় গভীর স্বাদ উপভোগ করে । জীবনে ফিরে এসে সে আর কখনও সংসার পৃথিবীর হিসেবি মানুষ হয়ে উঠতে পারে না...
তার মামার বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনার মাঝের গ্রাম গরীবপুরে । কাছেই আকাইপুর হল্ট স্টেশন, গোপালনগর । বিভূতিভূষণ, দীনবন্ধু মিত্রের জায়গা । যদিও বাবার কর্মসূত্রে সে থাকে শিল্পশহর দুর্গাপুরে ।
মা তার গোগ্রাসী পাঠক । বাবা মায়ের এই ইচ্ছে পূরণের জন্য যোগাযোগ করেন একজনের সঙ্গে । তাঁর নাম কিরণশঙ্কর রাহা । সেই ভদ্রলোক ডি পি এলে চাকরি করেন । কিন্তু তাঁর এক অদ্ভুত নেশা । তিনি একটি ভ্রাম্যমান লাইব্রেরির মালিক ।তাঁর উদ্দেশ্য ভালো বাংলা সাহিত্যের পাঠক তৈরী করা । তিনি বিয়ে থা করেন নি কখনও । ওই এক নেশা । সাহিত্যপাঠ । যারা তাঁর বইয়ের গ্রাহক তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে তাঁর নিজস্ব অটো রিক্সা করে দু ব্যাগ বই দিয়ে যান । মায়ের পনেরো দিনেই সে সব শেষ । এতোই নেশা যে রান্না করতে করতেও বই পড়েন বাঁ হাতে রেখে । একদিন তো ইলিশ মাছ ভাজতে গিয়ে অসাবধানে তেল ছিটকে প্রায় অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন মা । তবু গল্প বইয়ের কী দুর্মর নেশা । ছেলেটি তার স্কুলের বইয়ের চেয়ে এসব বইয়ের প্রতি আগ্রহী খুব । কবিতা নয়, তার স্বপ্ন তৈরী করেন বিভূতিভূষণ, বিমল মিত্র, জরাসন্ধ, মানিক, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সতীনাথ, শরৎচন্দ্র, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, সুনীল গাঙ্গুলি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু, শ্যামল গাঙ্গুলি, শঙ্কর, সন্তোষকুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, গৌরকিশোর, প্রমথনাথ বিশী। তাঁদের গল্প উপন্যাস গোগ্রাসে পড়লেও তখনো সেই বালক স্কুল পাঠ্য দু একটা লেখা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ পড়ে নি ।
এই গল্প উপন্যাস পাঠে ওই কিশোর উপকৃত হয়েছিল বেশী । প্রথমত তার প্রিয় বিষয় মানুষের মন । সে খুব গভীর ভাবে মানুষকে স্টাডি করতো ছেলে বেলা থেকেই । এরজন্য এই পাঠ তাকে উপকৃত করেছিল । দ্বিতীয়ত, বিষয় আর বিষয়ের পাঠে মন এতোই পেকে গিয়েছিলো যে উত্তরকালে তাকে কোনো বিষয়ই আর টানলো না সেভাবে । বিষয় বর্জিত নাটকহীন ছন্দহীন গল্প কাহিনী হীন কবিতাই তাকে পেয়ে বসলো ।
যাই হোক,সেই দুরন্ত উচ্চিংড়ে
(বাবার ভাষ্যে) কিশোরটি আর কেবল চুপ থাকে যখন তার বাবা তাকে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ান । রেডিওর অনুরোধের আসর বেজে ওঠে, তার বাবার বিয়েতে পাওয়া ছয় ব্যাটারির ফিলিপ্স রেডিয়োয় । উনো জমির দুনো ফসল, গল্প দাদুর আসর, মহিলা মহল, বিনাকা গীতমালা । শ্রাবন্তী মজুমদারের কণ্ঠের প্রেমে পড়ে ছেলেটি, বিবিধ ভারতীয় সেই সব ন্যাকা নমনীয় অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠের মোহময়ী ডাকে ।
এক একটা গান তার মনের এক একটা স্বপ্ন তৈরী করে । হেমন্ত, কিশোর, সন্ধ্যা, মান্না দে, সুমন কল্যাণপুর, বাণী জয়রাম, আশা, লতা মঙ্গেশকর , অখিলবন্ধু, পিন্টু ভট্টাচার্য্য, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র, উৎপলা ও সতীনাথ, মৃণাল চক্রবর্তী, সুধীন সরকার, তালাত মেহমুদের গান পুজোয়, লং প্লেয়িং গ্রামোফোন রেকর্ডের সুরে যখন আকাশে বাতাসে ভেসে উঠতো, তখন দূর থেকে কল্পনায় গিলতো ছেলেটি । কারণ সত্তর দশকে জাতক যে কোনো শিশুর জ্বর আসতো স্বাভাবিক ভাবে । যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, পুজো পার্বনে । ছেলেটির বাবার পেশার ব্যস্ততার জন্য প্রায় রাতে বাড়ি আসতো না । আর জ্বর গায়ে বিরক্ত তেতো মুখে রবিনসন বার্লি আর সাগু দানা খেয়ে, প্রায় বমি করতে করতে দেখতো, কখন ধীরে ধীরে ঘরের প্রগাঢ় অন্ধকার পাতলা হয়ে আসছে, নীল হালকা ব্লেডের মতো ভোর ছুঁয়ে যাচ্ছে দূরের আকাশে আধখাওয়া টিফিন কৌটোর মতো চাঁদ আর মা বসে বসে ঢুলতে ঢুলতে জল পট্টি দিচ্ছে । আর জানলা দিয়ে শিশির ধোয়া মাটির গন্ধে এক আঁশটে বিষন্নতা ছড়িয়ে দিচ্ছে শিউলির মৃদু শুদ্ধ ফুলেল গন্ধের অনাঘ্রাত অল্পলাল ভাষা...
দুই
উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান, আশির শেষে এবং নব্বই দশকের শুরুতে প্রায় অনেক বয়ঃসন্ধি যুবকের ছিলো । পরে নানান কারণে অনেকেই বিজ্ঞান থেকে সরে যায় । আমি তাও একবছর রাজকলেজে জুওলজি নিয়ে পড়ে শেষে হাঁপিয়ে উঠে বাংলা অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম রানীগঞ্জ, ত্রিবেণীদেবী ভ্যালোটিয়া কলেজে । তখন মাথার মধ্যে সাহিত্য পড়ার নেশা বেশ ভালো মতোই বাসা বেঁধেছে । একবছর বিজ্ঞান পড়ে যে নষ্ট হলো, তারমধ্যেও একটা ভালো দিক ছিলো আমার জন্য । সেইসময় বর্ধমানে সবচে নামি বইয়ের দোকান " দামোদর পুস্তকালয় " । ওই দোকান থেকে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের, " বঙ্গীয় শব্দকোষ " কেনার সুবাদে ওই দোকানের মালিকপক্ষ ও টুটুল দা ' র সঙ্গে একটা ভালো যোগসূত্র তৈরী হলো আমার । ওদের একটা পাক্ষিক সংবাদপত্র ছিলো । তাতে মাঝে মাঝে ফিচার লিখতাম । তো, ওদেরই প্রথম শারদীয় সংখ্যায় লিখে ফেললাম অতি উৎসাহে একটি কবিতার মতো কিছু । সবার মতো পরে যা দেখে আমার শব্দের আবর্জনা মনে হয়েছিল আর কী !
তো সেই লেখাটির আগে ছিলো সুকুমার সেনের একটি প্রবন্ধ, এবং আমার লেখার পরে ছিলো, সুনীল বসুর একটি কবিতা । অদ্ভুত কম্বিনেশন! যাইহোক টুটুল দার সুবাদে জীবিত সুকুমার সেনের বাড়িতে সেই প্রথম আমার ওদের শারদীয় সংখ্যা দিতে যাওয়া এবং কিছু সুখাদ্যের সঙ্গে ওনার মৃদু কণ্ঠে শুনেছিলাম কিছু রসিকতা । সুকুমার সেনকে প্রণাম করার মধ্যে দিয়ে স্পর্শ করেছিলাম আমি বাংলা ভাষার প্রবাদপ্রতিম সেই মহিরূহকে যিনি রবীন্দ্রনাথেরও সমীহ'র পাত্র ছিলেন । এবং উনি অস্ফুটে আশীর্বাদ করেছিলেন, টুটুল দা র প্রশংসিত প্রশ্রয়ে, ওটিই আমার বিরাট পাওনা ।
যাইহোক, বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয় । তা বলার বিস্তৃত ক্ষেত্র এটি নয় । তাও বলি, আমার কবিতা লেখার গত পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের যে খেলা, তার শুরুয়াত বা বীজক্ষেত্র প্রস্তুতির প্রথম পর্ব অবশ্যই, ত্রিবেণী দেবী ভ্যালোটিয়া কলেজ । ওই কলেজেই আমি পাই আমার দিকপাল দুই শিক্ষককে । যাঁরা নিজেরাই ছিলেন বড়ো কবি ও প্রাবন্ধিক । পার্থপ্রতিম বক্সী এবং আব্দুস সামাদ স্যারকে । কিন্তু তারচেয়েও বড়ো কথা এই দুজন প্রথম শিখিয়েছিলেন কী ভাবে আবহমান বাংলা কবিতাকে চিনতে হয় । সমালোচনামূলক সাহিত্যের উৎকর্ষতা কোথায় ? এজরা পাউন্ড এবং এলিয়েট কেন. কোথায় আলাদা । আধুনিক কবিতা পড়ার আগে মোহিতলাল মজুমদারের গদ্য' র পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অশ্রুকুমার সিকদারের প্রবন্ধ কিভাবে আমরা পড়বো, নানান জাতের কবিতাকে উপলব্ধি করতে গেলে সমালোচনামূলক দেশি বিদেশি লেখাগুলো কিভাবে পড়া উচিৎ । এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথকে । এই বনস্পতির বহুস্তরীয় লেখার এতো মহাজাগতিক আলো যা আমরা সংসার সীমান্তের যেকোনো তুচ্ছ অবস্থান থেকেও যদি লক্ষ্য করি তাহলে বুঝতে পারি, রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়ায় আমাদের সংক্ৰাম আনখশিখর অস্ত্বিত্বের সমস্তটুকু উদ্বোধিত হচ্ছে যে আলোকিত ভূষায় তার কোনোও প্রতিতুলনা নেই । নেই ঋণস্বীকারের ঔদ্ধত্য । তিনি তাঁর বোধির কল্পে যে সপ্তঋষির ঋদ্ধি -- শৃঙ্গে অবস্থিত, তাকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য কেন একজীবনই যথেষ্ট নয়, তাও অবাক বিস্ময়ে এঁদের আলোচনায় শুনতাম ।
দুজনের ঋষিতুল্য সিদ্ধি, ঐকান্তিক প্রয়াস এবং অফুর ভালোবাসা পেরেছিলো আমার মতো মধ্যমেধার সামান্যের রক্তে গুমখুন পলাশের রক্ত নিবিড় ব্যঞ্জনায় ছড়িয়ে দিতে । একটা ফুল ফোটারও শব্দ হয় । একজন আলাদা লিখিয়ের মাথায় শব্দের অপার সম্ভাবনা তৈরী হয় যা কাগজে ছাপানোর নয়, তার চেয়েও বর্ণ তৎপরতায় বেশী, মরিয়া মায়াতুর বিশেষ সংবেদনশীলতা
যদিও আমার মনে হয়, এঁদের রক্তে লাল রঙের সঙ্গে ঈষৎ নীল সাহিত্যিক বনেদিয়ানা বা তেজ ছড়ানো ছিলো । যার জন্য এরা ভুলে যেতেন পাঠদান কালে, স্থান কাল পাত্র, সাময়িক সময় এবং বৈষয়িক ক্ষুৎপ্রবণ দাস --ভর্তা জীবনের চাহিদা । এঁদের নিজস্ব জগৎ এরা তৈরী করেছিলেন, নানারকম সংকেত ভাবনায় বুঝিয়ে দিতেন এই জগৎ কেন তৈরী করার দরকার এবং তাকে লালন করতে হয় কিভাবে সমস্ত জাগতিক জীবনে...
প্রথম জীবনেই মৃত্যুর কাছাকাছি নৈসর্গিক স্বাদ গন্ধ বর্ণ রঙ ও রহস্যের কিছু সুদূরতা অস্পষ্টতা ও সীমাহীনতার অতলস্পর্শী তলানিতে তলাতে তলাতে যে বদ্ধ দরজার বিশাল লৌহনির্মিত নবতাল তালাটি এক ঝটকায় খুলে গেছিলো তা আর বন্ধ হয় নি । এরপরেও কয়েকবার অসতর্কতায় জলে ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেছি এর ওর সাহায্যে । যদিও সাঁতার শিখি নি কিন্তু কোনো ডুবুরির চেয়ে কম জানি না সেই অতল পাতাল বহুরৈখিক জলের গভীরতায় নৈঃশব্দ্যের ফ্যাসিস্ট কিভাবে বাজিকরের হাতে খুলে খুলে রেখে গেছে রাহী থেকে তনহাই । জগৎ আর স্বপ্নের মাঝখানের এক চুল দূরত্বে দাঁড়িয়ে এভাবেই তৈরী হয় নয়ন ফ্রেমের রূপসা মাফিয়া । টিফিনের সন্তুর, অঝোর বাই লেন, পুরোনো মোষের পিঠে চেপে বাঁকাবিহারী বা বহুদূরের বেঙ্গল স্কুল...পিকাসো ছড়ানো রোদ্দুর পড়া ক্লাস...
তো যে ছেলেটি ভুগতো পেটের রোগে, সেই কলেজে উঠে , শরীর চর্চার জন্য গ্যালো সুভাষ ব্যায়ামাগারে । ডাম্বেল বারবেল তুললো বেশ কয়েকদিন । খাবারে অরুচি কিশোর দিনে দিনে হয়ে উঠলো ভোজন রসিক । আর রাতবিরেতে জলসায় গান শোনার জন্য নতুন সিধু কানু স্টেডিয়াম, নেহেরু স্টেডিয়াম, সানডে ক্লাবের মাঠে বা ডোভার লেনের দুষ্প্রাপ্য টিকিট জোগাড় করা । হীরাবাই বরদেকার, আমজাদ আলি খান, নিখিল ব্যানার্জি, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া । এভাবেই একটু একটু করে গোপনে মকশো করা লেখার পাতা থেকে কবিতা পাঠালো সে,ভাবা রোড দুর্গাপুরে, জলপ্রপাত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদিকা নিভা দে ' র কাছে । এবং সেই প্রথম বার একগুচ্ছ ছাপানো লেখাসহ জলপ্রপাত সাহিত্যে তাঁর কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ এবং আরম্ভের সূচনায় এক পৃথিবী ধুয়ে যাওয়া শ্রাবণ সন্ধ্যা । এভাবেই আলাপ হলো দুর্গাপুরের নিম সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান হোতা সুধাংশু সেনের সঙ্গে । একে একে বিমান চাটুজ্জে, বিমান মাজি, মৃণাল বণিক, মানবেন্দু রায় ।
মনের জেদ তখন ইচ্ছে ডানা হয়ে আরো বড়ো আকাশে উড়তে চায় । সে চায় নতুন একদম নতুন কিছু লিখতে । নিজের ভাষায় যা একান্ত ভাবে তার নিজস্ব । যে ভাষা বাংলা ইংরেজি বা আঞ্চলিক নয়, একান্ত ভাবেই কবিতার ভাষা ।
সে ভাবে চিত্রকলা ক্যানভাসে বা সংগীত সুরের মাধ্যমে যদি ভাষার উর্ধে উঠে মানুষের মন মনন ভালোলাগা বা বিভিন্ন অনুভূতিকে ছুঁয়ে ছেনে আরপার করে দিতে পারে, তাহলে কেন কেন কেনই বা কবিতার ধ্বনি সংকেত বা উৎস সাংকেতিক শব্দ এমন এক কাঁটাতারহীন কবিতাকে বহন করে নিয়ে যাবে, যেখানে কবিতার ভাষা হবে ছবি বা গানের মতো আন্তর্জাতিক । সে নিজেদের কথা বলার জন্য বন্ধু স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়, এবং শিল্পী সঞ্জয় রক্ষিতকে নিয়ে শুরু করলো " কুরুক্ষেত্র " পত্রিকা । এই পত্রিকার টানেই সে ছুটে গেছে পাতিরাম থেকে বনগাঁর পত্রিকা মুহূর্ত, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির এরোকা পত্রিকা হয়ে বিষ্ণুপুরের সমাকৃতি, পুরুলিয়ার নাটমন্দির কিংবা বাঁকুড়ার কবিতা দশ দিন পত্রিকা । এভাবেই আলাপ একে একে তার নয়ের দশকের কবি বন্ধুদের সঙ্গে । সেই শুরুর দিনে তার জীবনে আরেকটি ঘটনা আরও বাঁকবদল নিয়ে আসে ।
ইবলিসের আত্মদর্শন ঘটেছে যে কবির, তিনি হলেন স্বনাম ধন্য পবিত্র মুখোপাধ্যায় । তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখা হয়ে যায়, আশির কবি, ধীমান চক্রবর্তীর সঙ্গে । এটাই ছিলো তার জীবনে মস্ত একটা ব্রেক । ধীমান দার সঙ্গে আলাপ । এই আলাপ দিনে দিনে নিবিড় গভীর হয়ে ওঠে । আস্তে আস্তে বুঝতে পারি, কারা আমার মনের লেখার কাছাকাছি । ধীমান চক্রবর্তীর আলাপ পত্রিকা ধরেই কবিতা ক্যাম্পাসে লেখার সূচনা । তারপর কবি বারীন ঘোষালের চিঠি । এরপর পরপর তিরিশ টি সংখ্যায় কবিতা আর গদ্য লেখা । পত্রিকাটি বাংলাসাহিত্যের অন্যতম দাদা পত্রিকা, নাম : কৌরব । স্বদেশ সেন শঙ্কর লাহিড়ী দেবজ্যোতি দা বারীন ঘোষাল প্রণব কুমার দে ও কমল চক্রবর্তী । জামশেদপুর এক শীতের সন্ধ্যায় প্রথম যাওয়া । কদমা, ম্যাংগো, ডিমনা, খড় কাই সুবর্ণরেখা দলমা সোনারি ওয়েস্ট লেয়াউট বা লেক টাউন বা গ্যালারি ফিফটিন । কতো শীতের তাঁবু । কতো ওয়ার্কশপ । কতো রাত জেগে আড্ডা ও বারীন দা ।
অন্যদিকে ধীমান দা কে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা -- দুর্গাপুরে যৌথ উদ্যোগে আট জন মিলে প্রতি মাসে এক ফর্মা, এই শিরোনামে, " ভিন্নমুখ " পত্রিকা তৈরী করা । আটজন কবি দুপাতা করে লেখা । নিজেদের লেখা । চূড়ান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়াস । ধীমান চক্রবর্তী, চিত্তরঞ্জন হীরা, স্নেহাশিস, পিনাকীরঞ্জন সামন্ত, দিশারী মুখার্জি, ব্রজকুমার সরকার, কল্যাণী লাহিড়ী এবং এই আমি । অন্যদিকে তখন, কুরুক্ষেত্র নিয়ে জমজমাট সাহিত্য আড্ডা । কলকাতার মোমার্তো মঞ্চ দখল এবং গোসাঁই ভজা সমকালীন অর্থাৎ নব্বই দশকের কিছু কবির দেশীয় পত্রিকায় ঠাঁই পাবার জন্য দিব্যোন্মাদ দশা দেখে হাসিই পেতো, আজও পায় । তবে সেই প্রথম দিনের লেখার সূত্রপাতকে কেন্দ্র করে যে উড়নচন্ডী যাপন, ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে এবং পায়ের নীচে সর্ষে নিয়ে যে রোমাঞ্চ অভিযান তা আর ফিরে পাবো কী ?আর না...
কালীঘাট ব্রিজের অসংলগ্ন রাতের অন্ধকারের আগে, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের মাথায় হাফ প্যান্ট পরে খালিগায়ে আহার শেষে দাঁত মাজতে মাজতে তরুণ কবিকে উৎসাহ দিতে দিতে যিনি বাসে তুলে দিতেন নিত্য, তিনিই আবার রন্ধন পটু, রসিক, বাকপ্রিয় এমন কী নয়ের দশকের প্রায় সব কবির অন্তত একটা দুটো হলেও লেখা ছাপিয়ে এই দশকের পরিবর্তিত পোস্ট কলোনিয়াল বা অধুনান্তিকতাকে ইতিহাস করেছেন কবি প্রভাত চৌধুরী ও কবিতা পাক্ষিক পত্রিকা...
আজ শুরুর দিনের এই স্মৃতিও মনে ফিরে ফিরে আসে...
এভাবেই শুরু...আজও চলেছি মননে নির্জন পথে । দেখি সারারাত জলে ভিজে ভিজে যে গাছ ভরা সবুজের ভেতর লাফিয়ে মাথা তুলছে একটি গুহ্য নীলের জন্য শহরতলি ছাড়িয়ে কোমল কালো ফুটেছে আরো...
দেখি ফোটার মুখে অনশ্বর অড়হর খেত
করাতকলের লেগে থাকা কিছুটা ঘুণ
সাবেক বটের পাতা স্তূপাকারে ঝরে পড়ে...
দেখি গোলা পায়রা উড়ছে আকাশে...
আর বনগাঁ হয়ে মামা বাড়ি যাবার জন্য শিয়ালদা -- বনগাঁ লোকাল যেই থেমেছে ঠাকুরনগরে , শেষবিকেলের নরম আলোয়, বিষণ্ণ মুখে স্টেশনের বেঞ্চে দূরে তুঁতে রঙের আলোয়ান জড়িয়ে একা কয়েকদিনের না কামানো সাদা কালো মুখের মধ্যে বসে আছেন কবি বিনয় মজুমদার...
সত্যি এ দৃশ্য আমি দেখেছি প্রায় তিরিশ বছর আগে...
আজও দেখি মনে মনে কখনও
হয়তো যেখানে পুরানা পল্টন ছিলো...
❑ কবিতার কথা: পাঁচ ❑
শাহী সড়কের পদাতিক
আমার পথ চলাতেই আনন্দ | ভাবি, সবার অজান্তে এসে অজান্তে থেকে সবার অজান্তে কোনোদিন মিলিয়ে যাওয়ার মধ্যে একধরণের উদাসী প্রেমিকের আনন্দ আছে | পৃথিবীর এতো রূপ ও অরূপ রস গন্ধ স্পর্শ রঙ এতো বিপুল বৈচিত্র এতো অঝোর বৃষ্টি, এতো বৈশাখের নির্জন ঘুঘু ডাকা দুপুর, এতো মেঘের আসমানি ভেলা ও শরতের ছাতিম, এতো হেমন্তের টুপটাপ পাতা ঝরা, এতো মিঠে শীতের রোদ এবং একই গাছে সারাবছরই একটু একটু করে বদলে যাওয়া পাতার রঙ, এই বিপুল সম্ভার উপভোগ করতে করতেই তো একটা জীবন কবিতা হয়ে ওঠে | সম্পর্কহীন নিস্পৃহ সম্পর্কে কতো না বলা প্রেম ও চলে যাওয়া | পাখি তার প্রতিদিনের আহার প্রতিদিন শেষ করে, আবার বেরোয় নতুন মাধুকরীর ডাকে | অনুভবের এই বেঁচে থাকায় বিষয়ী ক্ষতি হয়, হয় তুমুল বাহ্যিক প্রাপ্তির শূন্যতা কিন্তু তাতেও জীবনের উপেক্ষা বরং বাঁচতে শেখায় |
যাঁরা আমার মতো সত্তরে জাতক, আশির দশকে যাদের কৈশোর এবং নব্বই -- এ যৌবনের বেলা ছুঁয়েছে তাঁরা দেখেছে, দ্বৈত জীবনের সমস্ত | ঢাউস রেডিওর পাশে কম্পিউটার, ইউ টিউব গানের সংগ্রহের পাশে, কুকুর মুখের ছাপে লং প্লেয়িং গ্রামোফোন বা ক্যাসেড | আদিগন্ত খেলার মাঠ আর বর্তমান কৈশোরের কি নিদারুন পড়াশুনোর চাপ | তখন কেবল বাংলা মিডিয়াম আর এখন অজস্র ইংরেজি মাধ্যম ও অন লাইন ক্লাস | দেখেছি সুস্বাদু ইলিশের দর পঁচিশ টাকা আবার এখন বিস্বাদ স্টোরের মাছ এককেজি ইলিশ, দাম তেরোশো | দেশি মুরগির ঝোলের পাশে কে এফ সি বা ম্যাগডোনাল্ডের বাসি চিকেনের ঠ্যাং | যাত্রা শিল্প প্রায় উঠে গেছে | নেই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান নিয়ে সেই মারকাটারি ঝগড়া বা উৎসব | নেই গল্প দাদুর আসর, উনো জমির দুনো ফসল, মহিলা মহল, রেডিওর অনুরোধের আসর বা শুক্রবার রাত আটটার বেতার নাটক | নেই দেবদুলাল, নীলিমা সান্যাল, বরুন চক্রবর্তী বা তরুণ চক্রবর্তীর খবর পড়ার অসামান্য ভঙ্গিমা | নেই বিশাল সাটার দেওয়া টিভি, কালো রঙের টেলিফোন বা কেবল দূরদর্শনের দিন | নেই সিনেমা হলে সাদা কালো হলুদ টিকিট ও টিকিট ব্ল্যাকার, নেই প্রতি শুক্রবারে নতুন বাংলা ছবির ম্যাটিনি শো | অনেক না পাওয়া আর ছোটো ছোটো পাওয়া নিয়ে বাঙালির মানস ভোজের তীব্রতা আর নেই |
তো এভাবেই গড়িয়ে যাওয়া জীবনে, যখন স্কুল পাঠ্যের চেয়ে বেশী রোমাঞ্চ ছিলো নানান রকমের লাইব্রেরি ও হরেক রকমের বই | গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ, প্রবন্ধ সব কিছু নিয়ে সে এক মজার দিন |
এভাবেই, নব্বই দশকে এসে যখন কলেজে পড়ছি, বাংলা অনার্স নিয়ে, ত্রিবেণী দেবী ভালোটিয়া কলেজ, রানীগঞ্জে তখনই পেয়ে যাই আমার ভিত প্রস্তুতির কারিগর, দুই শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক, পার্থপ্রতিম বক্সি এবং আব্দুস সামাদকে | দুজনেই ছিলেন বিনয়ী পন্ডিত ছাত্র দরদী এবং কবি ও নাট্যকার | তাঁদের কথা সময় মতো একটু একটু বলবো | কিন্তু আজ বলবো, দুর্গাপুরে নিম সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশিষ্ট কবি গল্পকার ও প্রাবন্ধিকের কথা |
এটা বুঝে গিয়েছিলাম সাহিত্যের পাঠক হিসেবে ততদিনে যে, কি লিখছি সেটা বড়ো নয়, কি ভাবে লিখছি সেটিই বড়ো | এবং সেই লেখা তা গদ্যই হোক বা কবিতা, তাতে নিজস্বতা আনতে গেলে প্রথমেই দরকার নিজস্ব লেখার ভাষা কাঠামো এবং প্রকাশ ভঙ্গিমা নিয়ে নিরন্তর শ্রম ও অন্বেষণ | এই খোঁজ আমার ভেতর থেকেই ছিলো, তাতে প্রাথমিক ইন্ধন জুগিয়েছিলেন কয়েকজন, সরাসরি নয়, তাঁদের লেখাপত্র পড়ে এবং তাঁদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে |
ষাটের দশকে এই পশ্চিমবঙ্গেই কবিতার খোল নলচে বদলে দেবার জন্য বেশ কয়েকটি আন্দোলন হয় | সেটি কেবল কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, গদ্যে গল্পে উপন্যাসেও তার প্রভাব পড়েছিল | শ্রুতি, হাংরি, শাস্ত্র বিরোধী, থার্ড লিটারেচার প্রভৃতি | সত্তর দশকে সাময়িক কিছু দিনের জন্য হলেও আমার শিল্পশহর দুর্গাপুরেও একটি আন্দোলনের মতো, যদিও তাকে সেভাবে আন্দোলন বলা যায় না, সাহিত্য সংঘ তৈরী হয়েছিল |
" নিমসাহিত্য " পত্রিকার প্রকাশকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত ভাবনাপুঞ্জের একটি ধারণাকে আশ্রয় করে, কয়েকজন ব্যক্তির ভাষা নির্মাণের আয়োজন বলা যায় | যে কোনো আন্দোলনে পত্রিকার প্রকাশ এবং সুসম্পাদনা করার যে বৌদ্ধিক বিকাশ প্রয়োজন তা আমরা সে সময়, " নিমসাহিত্য " আন্দোলনে কোনো ব্যক্তির মধ্যে সবিশেষ লক্ষ্য করিনি | এমনকি প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত চিন্তনের বিকাশ যতটা তীব্র ছিলো, সমষ্টিগত চিন্তার বহুমুখীনতা তত বেশী একাগ্র হয়ে ওঠে নি | পত্রিকায় " নিমসাহিত্য " সম্পর্কে তাত্বিক লেখাগুলো লিখেছিলেন বিশিষ্ট কবি ও জন্মসূত্রে বরিশালের মানুষ ও জীবনানন্দের ছাত্র, সুধাংশু সেন | নিম সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন বর্ষীয়ান এবং সে সময় তাঁর বয়স আনুমানিক চল্লিশ উৎক্রান্ত | নিমসাহিত্যের এগারোটি সংখ্যায় তাঁর নামে প্রকাশিত হয়েছিল ' না -- প্রবন্ধ না -- আলোচনা ' উপশীর্ষক সহ দশটি গদ্য রচনা | সুধাংশু সেনের ঐ দশটি গদ্য পাঠ করলে নিম সাহিত্যের ' মোটিভ ' টি খুঁজে পাওয়া যায় | কিন্তু শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য এবং শিকড়ের সন্ধান পাওয়া দুস্কর হয়ে ওঠে | তাঁদের ম্যানিফেস্টোতে লেখা থাকতো ...." না সাহিত্য অল্প সাহিত্য তিক্ত বিরক্ত সাহিত্য নিম সাহিত্য "
সুধাংশু সেনের ঠিক পরে যাঁর নাম উল্লেখ করতে হয়, তিনি রবীন্দ্র গুহ | সমস্ত সংখ্যাগুলোতে সবচে বেশী পৃষ্ঠার লেখা ছিলো, তাঁর লেখা প্রথম পৃথিবীর নিম উপন্যাস, " নাভিকুন্ড ঘিরে " | যদিও অনেক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবি সাহিত্যিকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা নিজেরাই সেই সব আন্দোলন নিয়ে নিস্পৃহ, নিরুৎসাহী | রবীন্দ্র গুহ তাঁর আত্মজীবনীর খসড়ায় নিজেই সেইসব দিনের কাজ ও নিম সাহিত্য নিয়ে নির্লিপ্ত থেকেছেন | আড্ডা দিতে গিয়ে বলেছেন অনেক কথা রবীন্দ্র দা | কিন্তু ওটুকুই | তার বেশী কিছু নয় | এমনকি হাংরির অন্যতম প্রধান পুরুষ কবি প্রদীপ চৌধুরী আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং কাছের প্রদীপ দাও, হাংরি নিয়ে অত্যন্ত বীতশ্রদ্ধ মনোভাব পোষণ করেছেন | যাইহোক, এটাই বাস্তব, আন্দোলন ও সাহিত্য সৃষ্টি আসলে দুটি দুরকম দিক | যৌবনে যখন কবি ও গদ্যকার নিজের সৃষ্টির পথ খুঁজতে মরিয়া তখন সে নানারকম নিরীক্ষা বা আন্দোলনেও জড়িয়ে পরে | কিন্তু কবিতা লেখা একক ব্যক্তির নিজস্ব পথ | তাঁর জার্নি এবং ক্রম ও বিকাশ সবই চলতে থাকে তাঁর মাথার মধ্যে | একান্ত নিভৃত সাধনায় | তবে যৌবনে এইসব কার্যকারিতারও একটি ঐতিহাসিক মূল্য থাকে | যে কোনো তরুণ কবির, যিনি নিজের পথ খোঁজায় ব্যস্ত | যিনি কোনোভাবেই মনে করেন না, ঠাকুরের প্রসাদে, তাঁর ভর হয় এবং একটা ট্রান্স থেকে, কে যেন তাঁকে লিখিয়ে নেয়, এই হাস্যকর ভাবনা যাদের নেই, তাঁদের জন্যই আমার এই ধারাবাহিক লেখা | বলতে দ্বিধা নেই, আমি একজন কবিতা মজুর | অনেকের মতো আমার বাড়িতেও মকসো খাতা বিশ পঁচিশটা | মোটা জাবদা | আমি চিরকালই নিজের ভেতরের শব্দের সঙ্গে, যেখানে যত নতুন শব্দ পেয়েছি, খাতায় টুকেছি | বাক্য গঠনের সাবেকি ধারণাকে ভাঙতে গিয়ে হাজার হাজার বাক্যের মকশো করেছি | দীর্ঘদিন ধরে | কীভাবে একটি কবিতাকে অকৃত্তিম করা যায় এবং সমস্ত কবিতাটাকে চেতনায় রেখে তার শরীর ও মন, প্রাণ লাবণ্য গভীরতা সংস্থানে কীভাবে শব্দকে নিপুন ভাবে প্রয়োগ করা যায় বিমূর্ত ভাবনা থেকে বা কি ভাবে একটি শূন্য বৃত্তকে একটু একটু করে প্রয়োজনীয় রঙে ভরাট করা যায় অথচ তা আমার ভাবনাকে ঠিক ঠিক ভাবে পূরণ করবে এসবের ও শিক্ষা আছে, পন্থা আছে, প্রয়োগকৌশলের নিয়ম আছে | কোনো ব্যতিক্রমী বড়ো লেখক তাঁর আঁতুর ঘর সহজে দেখান না | পিছে পরে থাকতে হয় | থাকতে থাকতে শিখতে হয় | হ্যাঁ, আজ নির্দ্বিধায় বলছি, ছন্দ শেখার মতো, ধ্বনির প্রয়োগ শেখা, বা নানারকম রঙ চেনা, গানের সুরের বিপুল বৈচিত্রের দিকে মন দেওয়া, থিয়েটারের অভিনয় থেকে, ক্যানভাসের রঙ বা পেশিবহুল হাতে একটি ভাস্কর্য্য কিভাবে নানান ডাইমেনশন তৈরী করে, সেগুলোও শেখার | কিছুদিন এজন্যই থিয়েটার করেছি | শিখেছি থিয়েটারের অনেক দিক | সেসব প্রসঙ্গ ধীরে ধীরে আসবে |
তো যেটি বলছিলাম, এই নিমসাহিত্যগোষ্ঠীর প্রথম উপন্যাসের কথা বললাম | এই গোষ্ঠীর পরের বই, একটি গল্প বই | কবি মৃণাল বণিক প্রণীত | নাম " রাডার " | বইটির প্রথম প্রকাশকাল ১৫ ই আগস্ট ১৯৭২ | আমার জন্মের কয়েক মাস পরে | তখন তরুণ তুর্কি মৃণাল দা থাকতেন, দুর্গাপুরে, ৯/২১,দয়ানন্দ রোডে | এবং অবিস্মরণীয় এই গ্রন্থটির দাম ছিলো তখনকার বাজারে তিন টাকা | এই গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন সুধাংশু সেন | সেই ভূমিকার নাম ছিলো, " মৃণাল বণিকের প্রোপার্টি , কারেন্সি ও স্বয়ংক্রিয় নাভিমূল |"
যার ভূমিকার প্রথম কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি..." 0 ' র কোনো ভূমিকা নেই |,বর্তমান গল্পগ্রন্থের লেখক মৃণাল বণিক | আমি মনে করি তার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সে মস্ত বড়ো একটি 0 | সুতরাং মৃণালেরও আত্মগত কোনো ভূমিকা নেই | কিন্তু তার পায়ের এবড়ো খেবড়ো গোড়ালি, উঁচু কন্ঠাস্থি, পিত্তথলি, মেরুদন্ড এবং চোখের নিচে দুফালি ধূসর তৃণভূমি -- এমত কতিপয় স্থাবর প্রপার্টির অবশ্যই মূল লক্ষণাক্রান্ত অ -- চেতন ইতিহাস রয়েছে | অধিকার, অধিকারবোধ ও অধিকারসংরক্ষণ -- এই তিনটি প্রিমিটিভ মৌল প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজ বিপ্লবের পদযাত্রা শুরু হয়েছিল | এক টুকরো হাড়ের প্রতি সারমেয়ের যে অধিকার, বাঘিনীর তার শাবকের প্রতি যে অধিকার এবং সিংহের তার শিকারের প্রতি যে অধিকার ( ওয়েলস সাহেবের থিওরি ) তার রিয়েলিটি এবং আক্রমণ -- প্রতি আক্রমণের জৈবিক × ইন্টেলেকচুয়াল আত্মপ্রকাশের বুৎপত্তিস্থল, সেখান থেকেই মানুষের ভাষা -- art of communication মূল তিনটি প্রশ্নকে আশ্রয় করে সাহিত্যের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত | বিশিষ্ট লেখকেরাও তাঁদের রচনাকে ব্যক্তিগত মানবিক ভূমাতেই, সাহিত্যের এলিমেন্টকে নিঃশেষ করে দিয়েছেন | সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাই তাঁদের সাহিত্যকৃতির বিশেষ কোনো প্রভাব সুদূরপ্রসারী বা ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠতে পারে নি |
প্রায় ষাটের দশক পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ইনসেন্টিটি, জোব চার্ণকের কলকাতার চৌহদ্দির ভেতরেই ঘুরপাক খেয়েছে | বাংলা গল্প উপন্যাস ও কবিতার পাঠক প্রধানত ছিলো কলকাতার পাঠক | তাই ষাটের দশকের প্রায় শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলা সাময়িক পত্র পত্রিকার অধিকাংশই আত্মপ্রকাশ করতো একমাত্র শহর কলকাতা থেকেই |
এ পর্যন্ত বলা যায় লেখক ও প্রকাশকরা স্বাধীনোত্তর বাংলা সাহিত্যের এই সংকীর্ণতা ইতিহাস ক্ষমা করবে না | পৃথিবীর অন্যত্র প্রকাশিত পত্র পত্রিকার সঙ্গে তুলনা না করেও বলা যায়, বাংলা সাহিত্য অনেক পশ্চাৎগামী | বাংলা সাময়িক পত্র পত্রিকার সংখ্যা এখনো পাঁচশো ' র অধিক নয় | বাংলা সাহিত্যের এই অনগ্রসরতার জন্য কে দায়ী ? কেন এই পশ্চাৎগামীতা ? তরুণোত্তর সমাজের একাংশ নিশ্চিতই এ কারণে উদ্বিগ্ন, ক্ষিপ্ত এবং কোটারিগত সাহিত্যের রয়েল এক্সচেঞ্জ প্লেস ভেঙে ফেলতে উদ্যত | ঠিক এরকম একটা কড়া মেজাজ নিয়ে অনেকের অলক্ষে নিম জেনারেশন উদ্ভব হয়েছে ! এরা বলেন -- আমি আমার জীবনে পা বাড়িয়েছি -- ভূমিকার প্রয়োজন কি ? আমি আমার অস্ত্বিত্বের নিষ্ঠুর ও নির্লজ্জ প্রতিদ্বন্দ্বী | জীবন ও দৈনন্দিনতা এক অতিকায় যুগসন্ধিতে এসে পৌঁছেছে, এক অতীত রাত্রি ধীরে ধীরে তার খোলস ছাড়ছে, মৃত্যু, দুঃখ ও যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে সামাজিক গতি ও ভাবচেতনা আগাগোড়া আমাদের পাল্টে দিতে চায়, তাই আমি ও আমরা এই মুহূর্তে গল্প ও কবিতায় প্রজ্বলিত ও প্রকৃতিতে সংকেতময় হয়ে উঠি |
এবম্বিধ আত্মিক প্রতাপের উচ্চতম শিখরে সঞ্চরণশীল কিছু তরুণ লেখক, যাদের ভেতর মৃণাল বণিক দুই হাত শূন্যে তুলে দ্রুত অগ্রসরমান বাংলা সাহিত্যের রক্তনালিতে অন্তর্জগতে বিপুল গুপ্তধন খুঁজে বেড়াচ্ছে |"
ভূমিকাটি দীর্ঘ | সবটুকু তুলে দেওয়া যাবে না | কিন্তু সত্তর দশকের শুরুতে মৃণাল বণিকের " রাডার " বইয়ের ভূমিকায় এই সব কথাই বলেছিলেন তাঁর সহযোদ্ধা বন্ধু সুধাংশু সেন |
ভাবুন বন্ধু এই ভূমিকা সত্তর দশকের একদম শুরুতে লেখা | যখন সমস্ত ভারতবর্ষে রাজনৈতিক অস্থিরতা তুমুল | একদিকে পশ্চিমবঙ্গে নকশালবাড়ি আন্দোলন, অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশে শ্রীকাকুলামে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ | একদিকে রাষ্ট্রশক্তির পীড়ন এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে একেবারে নিকেশ করার পথে নামলো রুণুগুহ নিয়োগীর নেতৃত্বে সরকার পোষিত পুলিশ | একদিকে নগরনিবাসী ভাড়াটে সাংবাদিকদের স্বকপোলকল্পিত ফীচার আর ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবাহিত দৈনন্দিন রক্তপাতের ঘটনাগুলিকে, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসের পীড়ন শৈলীকে, নিরপরাধের আর্তস্বর সমূহকে এরা নিরুদ্বিগ্ন চাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে কি ভাবে !
সুতরাং শিল্পকে যদি কেউ পেশা করে বা প্যাশন মনে করে রুটির জোগাড় করতে চায় বা বাঁচতে যায়, স্বাধীন ভাবে নিজের কথা বলে, তাহলে এদের চক্রান্তের চক্রে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা প্রায় প্রতি পদক্ষেপে ঘটেছে ও ঘটে চলে | সোসিয়াল ডেমোক্রাটের জোব্বা পরা সাম্যবাদীরা চায় কবি ও লেখকের কাঁধে নিদর্শের নীতিদণ্ড রাখতে | অনুশাসনের উর্দিতে কবি ও লেখককে বাধ্যতামূলক শরীর ঢেকে নিতে, অন্যদিকে বিপরীত শিবিরটি এতোই চতুর তাঁরা কোনো স্রষ্টার সামনে কোনো বিধি নিষেধের শর্তাবলী আরোপ করে না | শিল্পীর স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা এইসব শব্দে যখন তাঁরা কোলাহল তুলে চলে, ঠিক তখনই তাঁরা একজন ক্রীতদাসের চারপাশে ক্রমাগত ঝুলিয়ে দিয়ে যায় প্রচারের অবিশ্বাস্য অদৃশ্য দড়ি গুলি, অপর্যাপ্ত টাকার থলির আনুগত্য, পুরস্কার ও প্রাপ্তিযোগের শিকল | এমন এক হিংস্র সর্বগ্রাসী, মানবিক মনোজগতে উপনিবেশিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একজন সচেতন মানুষ, একজন শিল্পী রুখে দাঁড়ান | একসময় গলিত ভাবনা / ভাষা / হাল্কা উপভোগের সামগ্রী হিসেবে দিস্তে দিস্তে ট্র্যাশ ও ভূষিমালের মতো নিরক্ত নিশিকড় লেখাগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন | ঠিক সেই সময়ই শুরু হয় তাঁর উপর মানসিক পীড়নের এক একটি পর্যায় | যুদ্ধের প্রথম দিকে সব সময় মনে হয়, ঐ রুখে দাঁড়ানো মানুষটি এক কল্পস্বর্গের অলীক বাসিন্দা, তিনি ক্রমাগত হারছেন, আর অন্যরা খিল্লি ওড়াচ্ছে | এই হেরে যাওয়া যেন তাঁর নিয়তি | কিন্তু সময় বদলায় | একসময় সময় চিহ্নিত করে মানুষটার চিন্তা ও ভাবনার নতুনত্ব কেন প্রাসংগিক | এবং এক নৈঃশব্দ্যের হাসি জিতে যায় কোথাও কখনো ....
রাডার ও গল্পের কিছু ভাষা

এই গল্প বইয়ে মোট বারোটা গল্প আছে | তার আগে বলে নিতে চাই, নিম সাহিত্য আন্দোলনের কবি ও গল্পকাররা চারিত্রিক এলোমেলো স্বভাবের মতো কাব্যধর্মে জীবনানন্দ, গদ্যরীতি কমল কুমার মজুমদারের কাছাকাছি, বিদ্রুপে দীপ্তেন্দ্র সান্যাল এবং ফ্যান্টাসিতে রাজশেখর বসুর উত্তরসূরি | এ কথা স্বয়ং বলে গেছেন, নিম জেনারেশনের তাত্বিক পুরুষ সুধাংশু সেন | তিনি মৃণাল বণিক সম্পর্কে আরো বলেছেন, এক হাতে রোলটার্নিং লেদের গিয়ার, কার্বাইড প্লাগ, টেমপ্লেট এবং অপর হাতে পুশকিন, চেকভ, বালজাক, পার্ল বাক, পল ডি ক্রুইপ, মার্ক টোয়েন | ভাবতে কিঞ্চিৎ বিস্ময় লাগে যে, সে প্রকৃতি ও জনসাধারণকে ভালোবেসে ফেলেছে অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব এক সাহিত্য প্রকরণের ভিতর দিয়ে | মৃণাল কুশলী ও দুঃসাহসী |
সুধাংশু সেন তো বলেছেনই, পাশাপাশি আমি আরো একটি কথা বলতে চাই | নিমসাহিত্য গোষ্ঠীর লেখকরা, সবাই কর্মসূত্রে ইস্পাত কারখানার বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন | নিজেদেরকে মনে করতেন কারখানার শ্রমজীবী | এই কারখানাকেন্দ্রিক জীবনের ছাপ তাঁদের লেখায় আমরা পাই | একটি সাহিত্যগোষ্ঠী এবং তাঁদের আন্দোলনের উৎস এমন একটি পেশা থেকে, যা বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্ব সাহিত্যেও সেভাবে দেখা যায় না |
এই গল্প বই থেকে, কিছু কিছু অংশ তুলে ধরছি এবার...

## " যেদিন অন্ধকারে তুমি গাত্রগন্ধ ছুঁড়েছিলে সেদিন আপোষহীন জিরাফ খিলখিল হেসে চলে গিয়েছিলো | কারণ সে তোমার চুলের খোঁপা চিবিয়েছিলো | চুলের কাঁটা গিলেছিলো | পায়ের আলতায় অন্য রঙ মিশিয়ে তোমাকে বেহুশ করতে চেয়েছিলো জানি, এবং সেজন্য তুমি অন্ধকারে গাত্রগন্ধ ছুঁড়েছিলে, তবু আমার ভয় করে, শর্মিলা আমায় ভয় দেখিয়ো না, আমি ভয় পাই, শর্মিলা চলো ঐদিকে ঐ অন্ধকারে, কেননা আলোতে আমার ভয় করে |" ( হুকুম, নেমে এসো )
## " সে একটি চেয়ারে বসে বললো --
তোমার বিবাহ হইয়াছে ? (না) হয় নাই ( না ) কে আছে ? ( কেহ নাই ) কেহ নাই ? (না) নাম কি ? কিছুক্ষণ পর সে বললো, কিছু উপদেশ দিই, শ্রবণ কর:
১/ জীবনের তিনটি বিষয়ের সমষ্টিফল = নারী
২/ বন্ধু ও প্রেমিকা পরস্পর পরস্পরকে ছেদ করিলে যে একশো একুশটি সমস্যার উৎপত্তি হয় তাহাদের সমষ্টিফল = মৃত্যু
৩/ কোনো বিশেষ অবৈধ ইচ্ছার উপর, আরেকটি অলৌকিক চেতনার আবির্ভাব ঘটিলে, যে দুটি শয়তানের আবির্ভাব হয় তাহাদের:
ওজন + গভীরতা + অনুভূতি = তৃতীয় নয়নে দিব্যদৃষ্টি আবির্ভাব |
এই বলে সে আমার দিকে জন্মকুন্ডলী ছুঁড়ে দিয়ে অদৃশ্য হলো |
আমি সংগীতময় কণ্ঠে চিৎকার করে তাকে ডাকতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না |
অবশেষ দুই হাতে মুখ ঢেকে চায়ের পেয়ালায় মুখ গুঁজে আমি বলে উঠলাম:
.... হে প্রজাপতি সিঁদুর দোয়াত ঘুঁটে চিতার শিখা গঙ্গাজল কীটপতঙ্গ জ্যোতিষী বৈকুন্ঠ প্রেম পুনশ্চ ডালি বৃক্ষ আয়না আর্য্যপুত্র ঘাট শূন্যতা জিহ্বা আক্রোশ ওষ্ঠ কুম্ভকার যোনি ও জরায়ু |
তোমরা দীর্ঘজীবী হও ...." (সূর্যমৃতপিতা )
## " হৃদয়ের সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েও শুষ্ক স্তনবৃন্ত চুষতে দেখে আমার পুরানো সাধ বুকের মধ্যে থরথর কাঁপে | দীর্ঘকাল পূর্বে আমি -- আমসত্ব, আম বা আমচুর খাওয়া হয়ে গেলেও হাত চাটতাম -- তখন আমি জানতাম না ...|
কল্যাণী আমার কল্যাণী, যে বাৎসল্যে গাভী তার নবজাতক সন্তানের গা চাটে, দূরন্ত বৈশাখের দিনে ঠোঁট চাটে কেউ, ঠিক সেভাবে মাড়ি চাটবার সাধ আমার কেন হলো | পৃথিবীর তাবৎ মণ্ডামেঠাই, তরল খাদ্য ফুলের বোঁটা ও তালের শাঁস ইত্যাদি ইত্যাদি অজস্র চাটাচাটি করেও আমার মনে পুরানো সাধ বারবার নতুন করে জন্ম নিত | আমার দুচোখ ও প্রতিটি ইন্দ্রিয় কল্যাণীকে খুঁজে বেড়ায় এখনো |

আমার জিভে এখন আর আগের মতন শক্তি নেই | তবুও কল্যাণী তুমি যেখানেই থাকো, তোমাকে আমি খুঁজে বার করবোই | তোমার মাড়ি চাটবোই | আপাতত বিক্ষুব্ধ চেতনা, দুচোখ ঝাপসা, হৃদয়ে ছয় ঋতু বারো মাস নত, বুকের মধ্যে দিয়ে ট্রেন চলে যায় শব্দ করে করে নিয়তই |
কল্যাণীর মাড়ি চাটতে পারিনি | তার স্বাদ ও অজানা, অপূর্ণ | এমন সময় ক্রমাগত পাকদন্ডী চক্কর এক ভয়ঙ্কর দিনে, আমি আমার হাতের শুকনো চেটো চাটতে চাটতে...
১০ মিনিট পর্যন্ত মনে হলো -- লোনা ....|
২৩ মিনিট পর্যন্ত মনে হলো -- কোনো স্বাদ নেই ...|
২৯ মিনিটে কষা ... এবং তারপর সর্বক্ষণই অজস্র রক্তের ঢেউ আমার মুখের গহবরে |
কল্যাণী আমার কল্যাণী ....| তোমার মাড়ি চাটবার সাধ ছিলো আমার অপরিসীম এবং আজও তা অপূর্ণ |" ( বিষণ্ণ বাদুড়)
এই গল্প বইয়ে শত শত এই উদাহরণ আছে | এবং অবাক হতে হয়, সত্তর দশকের গোড়ায় কলকাতাকেন্দ্রিক এলিট বড়ো বাড়ীঘেষা সাহিত্য চর্চার বাইরে দাঁড়িয়ে এভাবেই অবিস্মরণীয় বাংলা সাহিত্যের কাজ হয়েছে |
পাঠক দরকার হলে, এই বইটির নতুন সংস্করণ এখনো কিছু পাওয়া যায় | বইটি প্রকাশ করেছে প্রান্তর প্রকাশনী, সম্পাদনা করেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ট প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যের ভগীরথ, মানবেন্দু রায় |
এই একটি বই ও বইয়ের ভাষা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো | আমাকে নাড়িয়েদিয়েছিলো শক্তিশালী শিল্পী গদ্যকার নিমসাহিত্যগোষ্ঠীর, শ্রদ্ধেয় বিমান চট্টোপাধ্যায়, যখন তাঁর " ক্রীতদাস " ও " বাঘের লড়াই " গল্প বইদুটো পড়ি | তাঁদের আকর্ষণে, তাঁদের ভাষার আকর্ষণে একসময় এই দুর্গাপুরেই সত্তর দশকে আড্ডা দিতে আসতেন সেই সময়ের দুই তরুণ তুর্কি, বারীন ঘোষাল ও কমল চক্রবর্তী | সেসব বলবো, ধীরে ধীরে |

এবার যেটা বলার, এই মৃণাল দা ' ই আস্তে আস্তে লেখার ধারা বদলাতে থাকে | ভাষার ঝাঁজ কমিয়ে তিনি উৎকৃষ্ট কবিতা আমাদের উপহার দিয়েছেন অনেক | এই নিয়ে অনেক প্রশ্ন করেছি পরে, তাঁকে আমি | তিনি তখন নিরীক্ষামূলক সাহিত্য থেকে দূরে সরে গেছেন | মৃণাল দা ছিলেন আদ্যন্ত ভোজনরসিক | এবং একসময়, নিখিলবঙ্গের দূর্গাপুর শাখার প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন | খুবই রসিক, দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন | বলতেন তোমরা লেখো এখন | মনের দিক থেকে অনেক সরে গিয়েছিলেন তিনি | যদিও পরবর্তী কালে বারীন দা এলে, তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি | জমিয়ে আড্ডা দিয়েছেন এবং স্মৃতিরোমন্থন কালে, মৃদু মৃদু হাসতেন | কখনো হয়তো এইসব নিরীক্ষামূলক লেখা নিয়ে কিছুটা বক্র কথাও বলতেন | এমনকি একসময় আমাদের লেখালিখি নিয়ে একটি গদ্য লিখতে গিয়ে, আমার কবিতার উদাহরণ দিতে গিয়ে, বারীন ঘোষালের কবিতা এবং আমার কবিতা বলে বারীন দা র কবিতা ভুল করে দিয়ে দিয়েছিলেন | এ নিয়ে বারীন দা কে আমি বলি ও সেই আলোচনামূলক লেখাটি বারীন দা কে আমি দেখাই | বারীন দা, মৃণাল দা কে ফোন করেন | এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য মৃদু অনুশোচনা করে, বারীন দা কে বলেন, ভুল হয়েছে, কিন্তু তোমাদের লেখা একই তো | এতে কি আর অসুবিধা ! অবাক হলেও আমরা বুঝে যাই, মৃণাল দা আর সে মৃণাল দা নেই .. !

আসলে নিজের জার্নি পথে, বারংবার ফেরার একটা তাড়া ছিলো মৃণাল দা র | ছিলো অনিশ্চয়তার এক তাড়া | ছিলো হয়তো কোনো কিছু অপ্রাপ্তির বেদনা | যাঁর গদ্যে ও প্রথম দিকের কবিতায় আমি বিস্ময়ে বিমুগ্ধ ছিলাম, তিনিই তাঁর এই যাত্রাপথের অনিশ্চয়তায় ঘোর সংশয়ী হয়ে পড়ে ছিলেন নিজেই | এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং ভোজনরসিকতাই তাঁকে হয়তো জীবনের উপান্তে এনে ফেলেছিলো দ্রুত | এই বিরল সাহিত্যিকের এই হঠাৎ চলে যাওয়া মন মেনে নিতে পারে নি |
আজ থেকে ঠিক ১৫ বছর আগে তিনি আমাদের কুরুক্ষেত্র পত্রিকায় একটি কবিতা লিখেছিলেন | আমাদের কুরুক্ষেত্র পত্রিকায় সেটিই তাঁর শেষ লেখা | সেখানেও সেই অনিশ্চয়তার এক বিষণ্ণ কন্ঠ আমরা পেয়েছি | ধারাবাহিকের এই পর্বে সেই কবিতাটা দিয়েই আমি শেষ করবো...
" যে কোনো প্রশ্নের পাশেই উত্তরের আকাঙ্খা ঝুলে থাকে
রোদ ভালোবেসে জাগে শস্যের উঠোন
স্বপ্নের শিথিল কাঠামো ভেঙে প্রতি রাতে
কেউ কেউ বিছানায় জাগে টান টান
সিঁড়ির পর সিঁড়ি, অগোছালো স্থাপত্য বাহার |
তামাকের দাগে পোড়া ঠোঁট -- গল্প বলে |
গল্প শোনায় |
থেকে যাবার ইচ্ছে ছিলো, তৈলচিত্রে কুয়াশার মতো
মোম মসৃন রূপকথা ছুঁয়ে -- আরো কিছু দিন
স্রোতের উজান টানে স্বরলিপি ভেসে গেলে
সুর জাগে বিষণ্ণ গলায় |
যে কোনো যাত্রার আগেই ফেরার অনিশ্চয়তা
আমাকে আজ স্থবির করে রাখে |
(বিষাদ পাথর / মৃণাল বণিক)
❑ কবিতার কথা: ছয় ❑
ক
এই বৃষ্টিমুখর শ্রাবণে মন হয়ে পড়ে ভ্রমণ পিপাসু । আর ভোজনরসিক বাঙালির মতোই ছেলেবেলা থেকে মন ভিজে ওঠা শ্রাবণে, খোঁজে ইলিশের গন্ধ । সেই সত্তর দশকের শেষে যখন আমার আট ন' বছর বয়েস, দেখতাম বাবা জোড়া ইলিশ ঝুলিয়ে বাজার করে ফিরছে । তখন কেজির ওপর গঙ্গার ইলিশের দাম বাইশ -- চব্বিশ টাকা । খাঁটি গণেশের তেলে সেই মাছ পড়লে, পাড়াময় ছড়িয়ে পড়তো অনিঃশেষিত সৌগন্ধের ঈষৎ স্বর্ণাভ গুঁড়ো । তখন মাছের স্বাদে জলের মন বোঝা যেত । কালোজিরে দিয়ে ফালি বেগুনের টুকরো আর কাঁচা লঙ্কা চিরে মা যে উপাদেয় পথ্যটি তৈরী করতো, সেই স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় প্রতিষেধকটি মনকে সর্বদাই প্রফুল্ল আর আত্মমগ্ন করে রাখতো কাজের প্রতি । মায়ের হাতে, কলাপাতায় মোড়ানো ইলিশ ভাপা মুখে তুলে বুঝতে পারতাম, পৃথিবীর কোনো সুন্দর রমণীর আঙুল এতো নরম আর তুলতুলে নয় । ইলিশি' ই আমার মধ্যে আলাদা একটি স্বপ্নময় কাল্পনিক জগৎ তৈরী করতে সাহায্য করে প্রথম । আজ মধ্য বয়সে দাঁড়িয়ে বুঝি, কত ঝড় ঝাপ্টা প্রতিকূলতা বিপুল চাপ সবকিছু সয়ে গেছি এবং এখনো পর্যন্ত ওভারকাম করেছি, ঐ নিজস্ব মনোজগৎ বা আমার দ্বিতীয় পৃথিবীর জন্য । এরজন্য কয়েকজন মানুষ, আমার শৈশব এবং বেশ কিছু উপকরণ দায়ী । এদের মধ্যে ইলিশের ঋণ অস্বীকার করতে পারি না ।
ইলিশকে ভালোবেসে, তাকে জানতে গিয়ে জেনেছি, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির রকমফেরে ইলিশের মন উতলা হয় । এই ভ্রমণপ্রিয় মাছ এরকম সময়েই ডিম্ পাড়তে আসে নদীতে । সপরিবারে । দক্ষ জেলে বোঝে জলের মন । জলের রঙ বোঝে জেলে । গাব জল, চখা জল, কালো জল, চেরটা জল । তবে ঘোলা জলে ইলিশ থাকে বেশি । ইলিশ অনেক রকম । খয়রা, গৌরী, চন্দনা, গুরতা, সকড়ি, জাটকা, খ্যাপতা, মুখপোড়া...কত নামের ইলিশ । ১৮২২ সালে মৎস্যবিজ্ঞানী হ্যামিল্টন সাহেব এর বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছিলেন, হিলসা হিলসা । পরে এর নাম হয়, টেনুয়ালোসা হিলসা । এটি ল্যাটিন শব্দ । সৈয়দ মুজতবা আলি, তাঁর পঞ্চতন্ত্রে, লিখেছেন, নর্মদা উজিয়ে যে ইলিশ আসে, ভৃগুকচ্ছের মানুষের কাছে তা” মদার ।" তামিলরা ইলিশকে বলে,” উলম ।" গুজরাতিরা পুরুষ ইলিশকে বলে” পালভো ।” স্ত্রী ইলিশকে বলে,” মোদেন ।" আজ থেকে প্রায় ন ' শো বছর আগে জীমূতবাহন তাঁর বিখ্যাত” কালবিবেক” গ্রন্থে এই বিখ্যাত মাছটির নাম দিয়েছিলেন, ইলিশ । মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের” পদ্মানদীর মাঝী” উপন্যাসে আমরা শুরুতেই দেখি, রাত্রির গভীরে পদ্মায় ইলিশ ধরার রোমাঞ্চকর বর্ণনা । বাঙালির মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে, ইলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য । রাঢ় বাংলায়, তেঁতুলের আরকে ইলিশ মিশিয়ে যে পদটি তৈরী হয়, তা রেখে রেখে খাবার এক পদ্ধতি আছে, সেই প্রসেস টিও বড়ো রোমাঞ্চকর । মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল কাব্যেও ইলিশ পদের বাহারী রান্নার কথা আমরা পাই । ইলিশ নিয়ে বাঙালির রসনার কৌতূহল যুগযুগ ধরে । যদিও বর্তমানে ইলিশের অগ্নিমূল্য দাম অথচ স্টোরের মাছে সে স্বাদ আর পাই না....
তো, ইলিশের এই মরসুম বর্ষা কাল । বর্ষা কাল আমার খুব প্রিয় । আমার লেখালিখির জীবনে, এই বর্ষার একটি বিরাট ভূমিকা আছে । নয়ের দশকের মাঝামাঝি, লেখার ভূত যখন মাথায় তীব্র হয়ে উঠলো, তখন কোথায় কি ভাবে কাদের সঙ্গে মিশবো বা সাহিত্যের এসোসিয়েশন আমার কাছে প্রধান হয়ে উঠলো । এমত সময়ে, প্রথম একটি সাহিত্য সভার খোঁজ পাই । প্রতি শনি বার দুপুরে এই সাহিত্য সভার আয়োজন হয় । সেই সভাটি পরিচালনা করেন, শিল্পাঞ্চলের একজন বিশিষ্ট ছোটগল্পকার এবং সম্পাদক, পৃথ্বীশ চক্রবর্তী । তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাটি তখন রীতিমতো বিখ্যাত । পত্রিকাটির নাম,” ইস্পাতের চিঠি ।" সেইসময় তাঁর একটি ছোটোগল্পের বই নিয়ে রীতিমতো সভা সমিতিতে আলোচনা হত । বইটির নাম,” সময় ঈশ্বরহীন ।"
ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি, পৃথুল.. রাশভারী ভদ্রলোকটিকে প্রথমে দেখে আমি একটু ভয়ই পেয়েছিলাম । অন্ডালে থাকতেন তখন । উচ্চপদে চাকরি করতেন । মৃদুভাষী । সেই প্রথম কোনো সাহিত্য সভায় গিয়েছি । প্রায় সমস্ত সভা জুড়ে আমি ছিলাম নীরব ও মুগ্ধ শ্রোতা । নতুন গল্পের আঙ্গিক নিয়ে প্রচুর কথা বললেন অনেকে । অনেক তর্ক বিতর্ক হলো । কবিতা নিয়েও কিছু কথা হলো । সমস্ত অনুষ্ঠানে প্রায় চুপ করে থাকলেন পৃথ্বীশ বাবু । শুনলেন বেশি, বললেন কম । কিন্তু যেটুকু বললেন, সেটুকুর মধ্যেই তাঁর পান্ডিত্য আর নির্লিপ্ত বিজ্ঞানমনস্ক বিশ্লেষণ মনকে টানলো । পৃথ্বীশ বাবুর ভালো বন্ধু ছিলেন, মৃণাল বণিক, বিমান চট্টোপাধ্যায়, দেবাশিস দাশগুপ্ত এবং অবশ্যই উদয়ন ঘোষ ।
অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ এই মানুষটি, উপস্থিত কবি সাহিত্যিকদের জন্য গরম এবং অত্যন্ত উপাদেয় অন্ডালের স্পেশাল সিঙ্গাড়া আর এ ক্লাস দার্জিলিং চায়ের ব্যবস্থা করেছিলেন । সময়টা ১৯৯৬--১৯৯৭ । এতো বছর পরেও সেই স্পেশাল চায়ের গন্ধ নাকে লেগে আছে । মনে পড়ে, এই অনুষ্ঠানেই আমি পেয়েছিলাম, আমার দুই বন্ধুকে । সেই প্রথম আলাপ । তাঁরা সেই অনুষ্ঠানে ছিলো অত্যন্ত বলিয়ে কইয়ে । পরবর্তী আমার লেখালিখির জীবনে তাঁদের ভূমিকা যথেষ্ট । একজন, স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়, অন্যজন, দেবাশিস ভট্টাচার্য্য । সেদিন ফেরার পথে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল । আর অনেক কিছু ভুলে গেলেও সেদিন ভুলিনি, কানু ঘোষের সুরে, শ্যামল গুপ্তের কথায় অনুষ্ঠানের শেষে অবিকল তালাত মাহমুদের কণ্ঠে একজন গায়কের গান । সেই প্রথম এবং সেই শেষবার তাঁকে দেখি । এতবছর পরেও তাঁকে খুঁজে পাই নি আমি । গানটি হলো...
"যে আঁখিতে এতো হাসি লুকানো
কূলে কূলে তার কেন আঁখি ধার
যে মনের আছে এতো মাধুরী
সে কেন চলেছে বয়ে ব্যথাভার”...
খ
লকডাউনের আগের সন্ধ্যায় দুঃসহ গরম কাটিয়ে বৃষ্টি নেমেছে । রাস্তার মানুষ ঘরমুখী । বৃষ্টির ঝিরিঝিরি সন্ধ্যায় সাটার নামার আগে জানলার ওপার থেকে গান মিশে যাচ্ছে ।
“তোমায় পড়েছে মনে / আবার শ্রাবণ দিনে / একলা বসে নিরালায়, হায় / ভিজে যাওয়া বরষার হাওয়া / কেন নিয়ে এলো বেদনার খেয়া / মেঘলা মনের কিনারায় / হায়, নিরাশায় ডুবে যাওয়া এই নিরালায়...
অফিসফেরতা মানুষটি হন্তদন্ত, দুধের প্যাকেট, পাউরুটি পাওয়া চাই । ঘড়ির কাঁটা রাত আটটা না ছুঁতেই চা -- দোকানের আড্ডা ধীরে ধীরে কমে আসছে, কেটলি ধোয়ার শব্দ, এই সব নাগরিক শব্দের ওঠাপড়া নানা ধ্বনির মাঝেই তাঁর মন্দ্র কন্ঠ, অবিনশ্বর সুর । উত্তমকুমারের লিপে, রাজকুমারী তনুজার দিকে সেই দৃষ্টি ছুঁড়ে তিনি গাইছেন,” তবুও পরেও বলার যা ছিলো বলো, বলো কি বলিতে এলে / মুখে ঐ ভাষা কই, একি বলো ভালো লাগে / শোনো গান মনপ্রাণ ভরে নাও অনুরাগে .." কোথাও মিলি সিনেমায় মিলির অসুস্থতা আর গাঢ় বিষাদের মধ্যে..." আয়ে তুম ইয়াদ মুঝে / গানে লাগি হর ধরকন / খুসবু লায়ি পবন / মেহেকা চন্দন..."
কোথাও আবার ছলোছলো চোখে, মৃত্যু সজ্জায় শুয়ে, শায়র রাজা মুরাদের উদ্দেশ্যে,
রাজেশ খান্নার লিপে " ম্যায় শায়র বদনাম / ও ম্যায় চলা / মেহফিল সে না কাম / ও ম্যায় চলা / মেরে ঘর সে তুমকো / কুছ সামান মিলে গা / দিওয়ানে শায়র কা ইক দিবান মিলে গা ..."
তখন, অবিরল খাবার পৌঁছে দিতে দিতে হোম ডেলিভারির যুবকটি প্রাত্যহিক জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত, ক্লান্ত বাইকের চাকাতেও হঠাৎ -- গতি, কোত্থেকে তবু ভেসে আসছে,” সলাজে নত আঁখি / দুটি চোখ ভরে দেখি / যে আঁখির তারায় তারায় লেখা ছিলো নামটি আমার / স্বপনের গাঁথা মালা পরিয়ে দিলাম কণ্ঠে যে তার / আজ মিলন তিথির..." বা” আনেওয়ালা পল” -- এর শেষ সুরটুকু শুনে দোকান বন্ধ করছে, পাড়ার রাজু দা । এই করোনাকালীন বেসুরো জীবনে এই শ্রাবণদিনে, তিনিই কেবল সুরের জাদুতে আনছেন আরোগ্য । এই ৪ অগস্ট তাঁর জন্মদিন । তিনি কিশোরকুমার...
ভাবি, একজন মানুষের জীবনবোধ কত গভীর হলে, জীবনের সমস্ত অনুভবকে এভাবে সুরে সুরে রেখে যেতে পারেন । প্রথাগত গান না শিখেও সমস্ত ব্যাকরণের উর্দ্ধে তিনি যে ভাবে অক্লান্ত ক্ষতবিক্ষত সাধারণ ব্যর্থ মানুষের নিঃসঙ্গ যাত্রায় পাশে থেকেছেন বারংবার, যে উপার্জন, মৃত্যু আর অমৃতের তুচ্ছতার চেয়েও বড়ো, তাকে শেখা যায় না । এই যাত্রায় কোনো সঙ্গী নেই, সঙ্গ নেই, প্রিয় অপ্রিয় ঘনিষ্ঠ পর দূর আপন কাছের দূরের বিশ্বস্ত কেউ নেই । পৃথিবীর মানব সভ্যতার যাবতীয় প্রাপ্তির অনেক উর্দ্ধে এই অর্জন, সে ভাবে বোঝে ক জন !
সেদিন” জোকার” সিনেমাটা দেখছিলাম । ওয়াকিন ফিনিক্স । কি অসম্ভব অভিনয় । এই একটি চরিত্রের জন্য তাঁর প্রস্তুতি ! ব্যাটম্যানের ছায়া পড়বে না । পুরোনো কোনো পরম্পরায় নিজেকে হুবহু সাজানো নয় । একজন সাধারণ ব্যর্থ মানুষের জীবনের সমস্ত অনুভবটুকুর জার্ণি । কেবল ২৩কেজি ওজন কমানোই নয়, প্রথমেই এমন এক হাসির প্রস্তুতি, যাতে চিরকালীন প্যাথোজ আছে, আছে অমোঘ বিষাদ । যে হাসি যে মুখের প্রেক্ষায় আসে না, সেই অসম্ভবের প্রস্তুতির জন্য যে প্রাণপণ প্রয়াস এমনকি, এই সাইকো ক্যারেক্টারটিকে কোনো সাইকোলজিস্ট ডিফাইন করতে না পারে, তাঁর মনের অসম্ভব ভাঙচুর, একটা মিস্ট্রি অথচ সেই ছোঁয়া প্রকট নয়, এমন একটা জীবনের জার্ণি, হাজার হাজার অপমান, মার, কষ্ট, ব্যর্থতা, একাকিত্ব সহ্য করতে করতেও যাঁর হাসিটি তাঁর জীবনের অভিব্যক্তি হয়ে থাকে, তাইই চেয়েছিলেন, পরিচালক, Todd phillipo । এরফলে একটা অভিনয় মাস্টারপিস হয় না কেবল, সে শেখায় সব কিছুর উর্দ্ধে, কি ভাবে একটু একটু করে একাকিত্ব, এক মানুষ এক শিল্পীর জীবনে প্রধান অর্জন বা সম্পদ হয়ে ওঠে....
আমি সে ভাবে কোনোদিন ভালো ছাত্র ছিলাম না । বছরের পর বছর পাশ করে গেছি । মধ্যমেধার । বা খুবই সাধারণ । লাজুক, একা । কেবল মনের জমানো কথা লিখে গেছি, নিজেকে লেখা নিজের চিঠিতে । তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর একজন, যে গান পাগল, আদিগন্তবিস্তৃত মাঠে একা একা ছুটে বেড়ায় । তাঁর লাটাই ঘুড়ি আছে, কিন্তু সে ওড়াতে জানে না । সে কিছুটা সুতো ছেড়ে তার পর ঘুড়ি নিয়ে ছুটতে থাকে । ঘুড়ি তাঁর কাছাকাছি একই উৎসাহে ওড়ে । আকাশ তাঁর কল্পনায় এলিট দূরত্বে । তাঁর ছোটো মাপের রুগ্ন চেহারায় সে কৈশোরে নিজে

র মতো করে সবকিছু লুকিয়ে রেখে দিতো । তাঁর আকাশ, বৃষ্টি, গাছ, পাখি, রঙ, নদী, জানলা, পরিত্যক্ত জঙ্গলে ভরা বন্ধ কারখানার গেট, বুনো ফুলের গন্ধ, টুকরো টুকরো স্কুল ফেরতা কিশোরী সাইকেলের ঢল, ভোরের নির্জনতা, বন্ধ কারখানার ভাঙা পাঁচিলের গর্ত দিয়ে, পরিত্যক্ত রেলইয়ার্ডের লোকো সেটে একা একা ঘুরে বেড়ানো, এমনকি তাঁর দেখা জ্যোৎসনা রাতে সাপের মিথুন, পুরোনো কবর থেকে শিশুর কঙ্কাল -- মুখ নিয়ে ছুটে যাওয়া শেয়াল, পুরোনো ডি পি এল কারখানার মাঝ রাতের সাইরেন শুনে ভ্যান রিকশায়, নিশাচর কয়লা পাচারকারী কিশোরদলের সতর্কিত চলাচল, ডি পি এল কারখানা সংলগ্ন কোয়ার্টারের পেছনে শুয়োর পুড়িয়ে দিশি মদের সঙ্গে খেতে খেতে
, নেপালি বস্তির উল্লাস .. এভাবে সবকিছু তার মধ্যে আছে তার মতন করেই ।
মধ্য নব্বইয়ে যখন লেখার ভূত মাথায় চড়েছে, যখন সে পাগলের মতো সঙ্গ খুঁজছে এবং একটু একটু করে চেনা পরিচিতি হচ্ছে, তখন এরকম ' ই এক বর্ষার সন্ধ্যায় সে গিয়েছিলো দূর্গাপুর / ভাবা রোডে, নিভা দে সম্পাদিত জলপ্রপাত সাহিত্য পত্রিকার এক অনুষ্ঠানে । সেখানে সে দেখলো, দুর্গাপুরের তৎকালীন এক সেলেব্রিটি কবিকে । আগেই তাঁর নাম বলেছি,
সুধাংশু সেন ।
প্রথম দর্শনেই চমকে গিয়েছিলাম । অনেকটা কবি অরুণ মিত্রের সঙ্গে অবয়বগত সাদৃশ্য খুঁজে পেলাম আমি কবি সুধাংশু সেনের মধ্যে । তিনি বিশিষ্ট কবি এবং কবি জীবনানন্দ দাশের ছাত্র । নিমসাহিত্য গোষ্ঠীর প্রধান তাত্বিক এবং বলিষ্ট প্রাবন্ধিক । দুর্গাপুরে তখন তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি । প্রথমেই দেখলাম, গাড়ি থেকে নামার পর, দুদিকে তখন এক তরুণী কবি এবং আরেকজন ভক্ত তাঁকে নিয়ে নামছে । তাঁর উপস্থিতি যে আর দশ জনের চেয়ে আলাদা এবং তিনি যে এলিট সম্প্রদায় ভুক্ত, বুঝতে অসুবিধা হয় নি । ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত, অত্যন্ত গৌর বর্ণের এই কবির হাসি আর ধীরে ধীরে কথা রীতিমতো আকর্ষণীয় তখন তাঁর ভক্ত পাঠক পাঠিকাদের কাছে । পরে দেখেছিলাম, রীতিমতো কার্ড ছাপিয়ে, আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে, তাঁর বিধাননগরের বাড়িতে ডাকা হয় । এবং সেই জন্মদিনের অনুষ্ঠানও রীতিমতো স্বতন্ত্র । এর আগে আমি নিজের চোখে কোনোদিন কোনো কবির এইরকম জন্মদিনের অনুষ্ঠান দেখি নি । এলাহী ব্যাপার । সুবৃহৎ কেক কেটে, প্রচুর ভক্ত সমাগমের মাঝখানে, অসংখ্য উপহারসামগ্রী সহ পালিত হত ধুমধাম সহকারে তাঁর জন্মদিন । তাঁর বয়স অনুযায়ী মোমবাতি, সেই পরিমাণ গোলাপ, এবং উৎসাহী সুন্দরী রমণীকুলের উপস্থিতি এবং সাঙ্গীতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে তাঁর জন্মদিন পালন করা হত । কবি সেদিন নতুন শুভ্র বস্ত্র পরিধান করে, নতুন কোনো লেখা পাঠ করে শোনাতেন তাঁর আগ্রহী অধীর ভক্তদের ।

সত্যিই তিনি ছিলেন এক আকর্ষণীয় ব্যক্তি । যদিও তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ মোটেও সুখকর নয় । আমাদের কুরুক্ষেত্র পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হবে । একদিন অত্যন্ত আগ্রহ ভরে তাঁর বাড়িতে যাই, লেখা পাবার আশা নিয়ে । কিন্তু সব শুনে, তিনি আমার মুখের পরে বলেছিলেন,” দেখো ভাই, এরকম তো কতজনই লেখা চায়, আগে তোমাদের পত্রিকা দেখি, মান যাচাই করি, তারপর না হয়..."
সেদিন খুবই অপমানিত বোধ করেছিলাম । তরুণ রক্ত, তারপর চোখে নতুন কিছু করার স্বপ্ন, তাই মনে মনে ঠিক করি, এই বড়ো ও বিখ্যাত কবির কাছে কোনোদিন লেখা চাইবো না । পরের সংখ্যাও প্রকাশিত হয় । চলে যায় এক বছর । হয়তো কোনো ভাবে তিনি আমাদের দুটো সংখ্যা পড়েছিলেন । একদিন আমার বাড়ির টেলিফোন বেজে ওঠে । বাবার কর্মসূত্রে, তখন টেলিফোন ছিলো আমাদের । তো, সেই টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে ওঠে, কবি সুধাংশু সেনের কন্ঠ । তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ভাবেই বলেছিলেন, একবার ওনার সঙ্গে দেখা করতে । আমি হ্যাঁ বলেও যাই নি । এড়িয়ে যাই । আরো কিছুদিন পর, একটি সাহিত্য সভায় যথারীতি ওনাকে ঘিরে ভক্তের দল । তো আমি পাশ কাটিয়ে, দূরের একটি চেয়ারে বসে ছিলাম । উনি মঞ্চে কিছু পাঠ করার পর, নেমে যখন কিছুক্ষণ থেকে চলে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ভিড়ের এক কোণে আমাকে দেখে থেমে যান । আমাকে কাছে ডাকেন এবং ভিড়ের মধ্যেই জড়িয়ে ধরেন । হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরার জন্য, পাশে থাকা ভক্তকুল এবং আয়োজকরা ভাবতে থাকেন, কে এই অনাহূত, অপাংতেয় । তাকে সুধাংশু সেন জড়িয়ে ধরছেন !
আমি ও রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করছি । হঠাৎ এই নাটকীয় মুহূর্ত কেন ?
তিনি দেখি আমার হাত ধরে, মঞ্চের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন । সে এক ঝকমারি ! না পারি তাঁকে অসম্মান করতে, আর না ইচ্ছুক মঞ্চের দিকে যেতে । তো একসময় বাধ্য হয়ে যেতেই হলো । মনে পড়ে, সেদিন তিনি মঞ্চে উঠে, আমাদের কুরুক্ষেত্র পত্রিকা এবং আমার লেখা নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছিলেন । এবং শেষে হঠাৎ বলে বসলেন, দুর্গাপুরে অদ্যাবধি এতো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী পত্রিকা এর আগে আসে নি । এবং তিনি আমার লেখা পড়ে এজন্যই আনন্দিত যে নিরীক্ষামূলক যে সমস্ত কাজ একদিন তাঁরা শুরু করেছিলেন তাঁদের মতো করে, আমার মধ্যে তাঁরই ছায়া তিনি দেখতে পেয়েছেন । সেদিন মনে পড়ে, যতক্ষণ তিনি ছিলেন আমার হাত ছাড়েন নি এবং বারংবার আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেই থাকলেন, আমার বাড়িতে একদিন এসো....
যাইহোক অনেক দ্বিধা কাটিয়ে একদিন তাঁর বাড়িতে সন্ধে বেলায় গেলাম...
গ
তিনি অত্যন্ত উষ্ণতার সঙ্গে হাসি মুখে তাঁর ঘরে আমাকে ডাকলেন । সেদিনও ছিলো, বৃষ্টিভেজা এক দিন । তো, তাঁর পুত্র নাতি নাতনি নিয়ে সংসারে কিন্তু তাঁর এক নিজস্ব ভূমিকা ছিলো । বাড়ির সবাই তাঁকে, রীতিমতো শ্রদ্ধা করতো এবং মান্যতা দিতো ।
সেদিন তিনি আমাদের পত্রিকার ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং সদ্য লেখা কয়েকটি কবিতা দিয়ে বললেন, যদি পছন্দ হয়, দেখো । না হলে নয় । বয়স বেড়েছে, তোমাদের মতো তো সেই শক্তি কলমে আর নেই, তবু যদি মনে হয়....
আমি বিস্মিত হলাম । লেখাগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে গেলাম বাড়ি ।
এরপর অনেকবার সুধাংশু সেনের বাড়ি গেছি । তিনি তখন সুধাংশু দা । এবং আমি তাঁদের কর্মকান্ড নিয়ে পড়াশুনো করলেও, মোটের ওপর বাহ্যিক মুখোশের ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠি নি । মূর্খ ও বটে । তাই মনের কথা মুখ ফুটে বলে ফেলি এবং তার ভালোমন্দ বিচার করার মতো ড্রইংরুমের এলিট ভদ্রতা জানি না ঠিক । তাই একদিন তাঁকে কিছু প্রশ্ন করেছিলাম । যা অনেকদিন ধরে মনের মধ্যে ছিলো ।
" আচ্ছা সুধাংশু দা, আপনারা যে নিমসাহিত্য গোষ্ঠী তৈরী করেছিলেন এবং যা যা ভেবেছিলেন তার থেকে দূরে সরে গেলেন
কেন ?
সুধাংশু সেন -- আসলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গুরুত্বও কমে আসছিলো, তাই ।
আমি -- এবং তার জন্যই, কেউ আর উৎসাহী ' ই নয় । আপনাকে কেবল জীবনানন্দের ছাত্র হিসেবেই লোকে জেনে গেলো ! অথচ, এই নিমগোষ্ঠীর আপনিই ছিলেন প্রধান ত্বাত্তিক । আপনারা নিজেরাই আপনাদের অতীত গৌরব নিয়ে নিস্পৃহ, তাহলে অন্যরা কেনই বা উৎসাহ দেখাবে ?
সুধাংশু সেন -- মৃদু হেসে চুপ করে রইলেন ।
আমি -- আচ্ছা একটা কথা বলবো, কিছু মনে করবেন না তো ?
সুধাংশু সেন -- কি ?
আমি -- এই ভক্তবৃন্দের কপট উচ্ছাস আপনার ভালো লাগে ?
সুধাংশু সেন -- কপট বলছো কেন ? ওরা ভালোবাসে, তাই আসে ।
আমি -- কিন্তু ওরা কিছুই পড়াশুনো করে না । সাবেকি ভাবনা, ন্যাকা ন্যাকা গদগদ মোটা দাগের ছন্দে লেখা কবিতা পড়ে মনে করে, এটাই কবিতা ! কোনো খোঁজ নেই, অন্বেষণ নেই, পড়াশুনো নেই । এখন কবিতা আর একক শিল্প মাধ্যম.. ? কবিতায় সিনেমার দৃশ্য, কত ছবি ও ভাস্কর্য্য, কত রকমের নিরীক্ষা । আমার তো মনে হয়, কবিতা যে এখন লিখবে, তাঁকে এই সমস্তটাকে আত্মস্থ করতে হবে । অনেকেই মনে করে, কবির ভর হয়, কে যেন তাঁকে কবিতা পাইয়ে দেয় । এখনো অনেকে মনে করে, দিনের শেষে বাড়ি ফিরে সে কেবল কবিতা পড়বে এন্টারটেনের জন্য । কি ডিসগাস্টিং !
কোনো শ্রম, প্রস্তুতি ছাড়াই কবিতা এসে দিয়ে যাবে ঈশ্বর ! আপনি তো নিজেই ভালো করে জানেন, জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপিতে কত কাটাকুটি, কত অতৃপ্তি, কত শ্রম....
সুধাংশু সেন -- ঠিকই বলেছো । আসলে আমার মনে হয়, সবকিছুর মধ্যে থেকেই একজন লিখিয়েকে, আলাদা হতে জানতে হয় । বুঝতে হয় তাঁর চেতনার জায়গাটাকে । নিজের বিকল্প পৃথিবী তাঁকে নিজেকেই তৈরী করতে হয় । তাঁর একাকিত্ব তাঁর অর্জন । একাকিত্বের গভীরতা থেকে প্রাপ্ত বোধ সবার থাকে না । সেই নতুন যে এগিয়ে থাকে সময় থেকে কয়েক যোজন । তোমার কি মনে হয়, আমি একা নই ? প্রতিদিন আমারও তীব্র অন্বেষণ সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়ে, ভাবনার যে সংঘটিত প্রবাহ, তার আলোকিত অন্ধকার আর বিপন্ন ক্ষয়ের যে মানবিক সংবেদ তাকে খোঁজা । দীর্ঘদিন আমি ভিলাই ছিলাম, তারপর এলাম, এখানকার ইস্পাত কারখানায়, আমি দেখেছি মানুষের খিদে ব্যর্থতা আর হেরে যাওয়া জীবনের সংশয় । মানুষ মানুষকেই পণ্য করে জীবিকা করে । তাঁর তীব্র ভেঙেচুরে যাওয়া মুখের গভীরে মুখর মুখের যে নিদারুন সংকট যে অবরুদ্ধ প্রতিবাদ আমি এসব চিনি । আমি মর্মে মর্মে জানি, বিপন্ন বিস্ময় কি ? কেন মানুষ নিজের মুদ্রাদোষে একা হয় তাও...

আরো নানারকম কথা হয়েছিল । তারমধ্যে যে কথাটি আমার মনে গেঁথে আছে আজও, সেটি হলো, আজগের সময়ে দাঁড়িয়ে যেটি লেখালিখির ক্ষেত্রে বড়ো, তুমি কি লিখছো তার চেয়েও বড়ো কীভাবে লিখছো । নিজের লেখা টু লেখার ভাষাকাঠামো তৈরী করতে সারাজীবন হয়তো চলে যাবে, অনেকেই প্রয়াসী হয়েও পারে না । অনেকে সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করেও,
মাঝ পথে খেই হারিয়ে ফেলে । অনেকে শুরু করেও পরে সামান্য কিছু বাহ্যিক চাহিদার জন্য নিজের নির্লোভ সাধনক্ষেত্র থেকে সরে, বালখিল্য লেখা শুরু করে । শেষে পাঠকও সন্দেহ করে সেই সংশয়াচ্ছন্ন লেখককে । তাই শুরু করলেই হয় না, বাঁকে বাঁকে নতুন খাদ কুয়াশা রহস্য প্রতিকূলতা নতুন চ্যালেঞ্জ । এই ধ্বক নেওয়ার জন্য যে আত্মবিশ্বাস দরকার একজন লেখকের, সেটাই প্রায় অনেকেরই থাকে না । এ জন্যই বারীন ( ঘোষাল ), স্বদেশ বাবু ( সেন ) আমার এতো প্রিয় । কারণ যে নতুন কিছু করবে, নতুন পথে যাবে তাঁকে শহীদ হতে হবে । তোমার সামনে দুটো পথ । একটি বাহ্যিক প্রাপ্তি, একসময় নিজের নকল করে করেই লেখক হেরে যায় । আর একটা সমস্ত কিছুর বাইরে । তাতে কোনো প্রাপ্তি নেই । প্রয়াসী অনেকেই কিন্তু একটা শতাব্দীতে দুএকজনই ।
কিন্তু প্রয়াসী হওয়াও কম নয় । যদি সেই ভালোবাসা, সেই খোঁজ, সেই জার্ণি, সেই তীব্র আনন্দিত জীবন চাও, তাহলে ভুলে যাও, কোথায় কোন বড়ো বাড়ির আশ্রয়ে লিখছো । ভুলে যাও, কেবল লেখো আর খোঁজ নিজের পথ । প্রতিটি লেখাই শূন্য থেকে শুরু হয়, প্রতিটি ইনিংস নতুন । একটা শূন্য তোমার জন্য । তাঁকে ভরাট করার দায়িত্ব, বারংবার তোমার ।
সেদিনের এই কথা আজও ভুলি নি । লিখতে না পারলেও নয় । এই কথাই আমাকে অন্য ভাবে বলেছিলেন পরে, বারীন দা ( ঘোষাল ), স্বদেশ দা ( সেন ), মণীন্দ্র বাবু ( গুপ্ত )
সে সব প্রসঙ্গ আসবে ধীরে ধীরে...
তবে একটা জিনিস দেখি আর আজ ভাবি, কিছু কিছু কবি আছেন যাঁরা চিরকালই অন্যের কবিতা প্রমোট করে যান । সুইচড অন অফ বোঝেন না । তিনি এতোটাই অন্যের ভালো ভালো কবিতা আত্মস্থ করেন যে সেটিই তার বদহজমের কারণ হয়ে দাঁড়ায় একসময় । সেই ভালো কবি, অন্যের কবিতা ও সাক্ষাৎকার বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়িয়ে পড়িয়ে অন্যকে ঋদ্ধ করেন, নিজেও প্রভূত ভালো কবিতা লেখেন কিন্তু তার কবিতায় যতটা চিনি-- গুড় , ঠিক ততটাই গতানুগতিক । না আছে এক্সপেরিমেন্ট না আছে বারংবার বাঁকবদলের খোঁজ । নানারকমের কবিতা পড়া আর নিজের কবিতার জার্ণি যে হেল এন্ড হেভেন আলাদা, এটাই অনেকে বোঝেন না দেখি...
আবার এও দেখি, অনেক অতিবিপ্লবী কবি ও সম্পাদক, তাঁর সমকালীন দশকের ভূয়সী নিন্দামন্দ করেন, কিন্তু একসময় তিনিও তাইই লিখতেন, এবং বড়ো বাড়ির প্রসাদপ্রার্থী ছিলেন । পরে অতি বিপ্লবী হয়ে যান । এবং না সেভাবে পড়েন তাঁর সমকালীন দশকের শক্তিশালী লেখা না খুঁজে দেখেন ব্যতিক্রমী কারা ! আসলে এ সব বিপ্লবীরা, নানারকম দীর্ঘ চাহিদামতো প্রত্যাশাপূরণ না হবার জন্য, দীর্ঘদিন মনে ক্ষোভ পুষে রাখেন । আসলে প্রথম থেকেই এঁদের লক্ষ ছিলো এক, জীবনে হয়েছে
আরেক, তাই সেই চাপা রাগ অভিমান ক্ষোভে তারা এতোই অস্থির হয়ে পড়েন যে তাঁদের মুখোশ গলে যেতে থাকে ক্রমশ, বারংবার । যিনি নিজের আনন্দেই লিখবেন এবং লেখার আনন্দ আর কাজ করে যাওয়াটাই যাঁর
এজেন্ডা, তিনি না হন বিপ্লবী, প্রতিবিপ্লবী বা অকারণে বিষ ওগড়াবেন না এর ওর কথা ভেবে মাঝে মাঝেই । লেখার এই আনন্দ এই জার্ণিটুকুই সব । যে উপলব্ধি করে, সে তাতেই মজে থাকে ।
ঘ
' আভাভিলা ' -- D -- ২৩৯, কুপার স্ট্রিট, বিধাননগর, দুর্গাপুরের এই ঠিকানায় থাকতেন একসময় নিমগোষ্ঠীর মেরুদন্ড কবি সুধাংশু সেন । এই গোষ্ঠীর পাকস্থলী বলা হত রবীন্দ্র গুহ । নাভিমূল বিমান চট্টোপাধ্যায়, ফুসফুস বলা হত মৃণাল বণিক, কন্ঠাস্থি নৃসিংহ রায় ও নিতম্বস্থি ছিলেন অজয় নন্দী মজুমদার । নিমসাহিত্যের একটি গাণিতিক চেতনার মধ্যে দিয়ে সাহিত্যজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বদলকরণ ও নতুন ব্যাকরণের ব্যক্তিগত বিস্ফোরণে শিল্পহীনতার থেকে বন্ধনহীনতার দিকে । বোধের মূলে নাইট্রিক এসিড ব্যবহার করে এবসল্যুট নয়, স্ট্রেট ফরোয়ার্ড এক্সপোজার পারিপার্শ্বিক সমস্ত মূল্যবোধ ভেঙে পাপপুণ্যকে অগ্রাহ্য করে এক নতুন রেলিভেন্ট চালচিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল একসময় যে কটি বই, তারমধ্যে সুধাংশু সেনের ' হরাইজেন্টাল কবিতা ' বা ' না -- প্রবন্ধ না -- আলোচনা : নকশিকাঁথা ফানুষ ও অস্ত্রশস্ত্র ' নিরীক্ষামূলক সাহিত্যের অন্যতম আকরগ্রন্থ বলে চিহ্নিত হলো ভাবীকালের ইতিহাসে । যদিও এই সমস্ত বই অত্যন্ত দুর্লভ, আজ আর পাওয়া যায় না । রবীন্দ্র গুহ' র ভাষায়, সুধাংশু ছিলেন শান্ত ধীর উদার । তাঁকে আমরা দলের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলেই মনে করতাম । সুধাংশু কখনো কারো প্রতি বেয়াক্কেলে মন্তব্য করতো না বা কারো আড়ালে কূটনিন্দা করতো না সে ।
পথ আসলে পদাতিকের দিনানুদৈনিকের অভিজ্ঞতার সমীকরণ । রাস্তা হলো রাহীর ।ফুটপাথ নাগরিকের । গ্রাম্য পায়ে ওড়া ধুলোভরা মেঠো রাস্তা ফকির, বাউলের । সড়ক, রাতের ধাবা ফেরৎ সর্দার ট্রাকড্রাইভারের । শাহী সড়ক দুরন্তগতির যানবাহনের, আর সমস্ত চলাচলের গহন পদক্ষেপে যেখানে অনাসক্ত হাওয়ায় মিশে যায় ফোঁটা দু ফোঁটা শরত শিশির । কণে দেখা আলোর নিরালা সৈকতে তৃষ্ণা থেকে তৃষ্ণা
ওঠে । অপেক্ষা করে ফেরারী শ্রমণ বা স্বেচ্ছা নির্বাসিত সংসার পৃথিবীর কোনো একাকী ভাবুক । ভিনপথের কবিতা বা গদ্যের আন্দোলনে যে প্রথম থেকেই, ভিড় ট্রেনের নিত্যযাত্রীর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে সেই কবি, সুধাংশু সেনের পথে যদি কখনো পা মেলান পাঠক, তাহলে হয়তো পথের মানে বদলে যেতে পারে তার কাছে । ক্রমাগত জীবনের বস্তুসমাহার বা আলো আঁধারিতে কতো মুখের ছায়া, আপাত -- বাস্তব ও পরাবাস্তবের দোলাচল তার জগৎপটের অজস্র সংকেত, অকিঞ্চিৎকর অনুভূতির প্রগাঢ় বিন্যাসে এক দূরন্ত আত্মজৈবনিক না জৈবনিক ভাষাচলের আভাসিত কবিতাঘূর্ণি উপচে পড়ে । ফেনা ও ক্কাথ মোচন করে পাঠকের । এক মুহূর্তেও তিষ্টোতে দেয় না । লিখনভঙ্গীর অভিজ্ঞতালব্ধ একক এই হার্মিটেজ । সম্পৃক্ত রচনাক্রিয়ার কখনো কখনো বস্তুভাবের সম্পর্কস্থাপনহেতু মনীষার ক্রান্তদর্শী ভাবনাশৈলী গঠনের ধ্যানমগ্নতা আমরা পাই তার পরের দিকের কবিতা বইগুলো থেকে । বইগুলো হলো যথাক্রমে, প্রিয়ভূমি অনুপম অন্ধকার, অবিনাশী শব্দমালা, অনতি দীর্ঘস্বর, যেতে যেতে পথের সঙ্গে কথা বইগুলো থেকে ।
নিজের কবিতা প্রসঙ্গে সুধাংশু সেনের একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ স্মরণ করা যাক --” আমার কাছে হারিয়ে যাওয়া কোনো পথ নয় কবিতা । পথের মতো সময়ের উচ্চবাচতা থাকতে পারে ভাঙাচোরা কুটিল গতি, গতির পরিবর্তনগুলো কল্পনা ও প্রতিভার প্রতি ভরসায় থাকে, বাস্তবতার উপলব্ধি থেকে বারবার বাঁক নেবে কবিতা, ফলত সর্বজনগ্রাহ্যতায় কীভাবে ধরা যাবে ? স্বর্গ ও আঘাটা স্বাভাবিক, স্বাভাবিক ভীষণতার কাছে নিয়ে আসে যেন আর প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়া তা মানুষের প্রকৃতিতেই আছে ।"
সুধাংশু সেনের কবিতা পড়তে পড়তে যা মনে হয়, সাবলীল চলার নিজস্ব নির্মিতিক্রিয়া এবং নির্ণীয়মান মুহূর্তগুলো । ভিশন আস্তে আস্তে ননভিশনের যাত্রাপথে গড়ে তোলে জীবনবোধের ছবি । একটি গহন চলার ভেতরে মানুষের চিরকালীন চলান্তরের কালাতিক্রমী ছবি । কবি যেন অবচেতনের খননবিন্দু বা ডিসকোর্সটাকে তুলে ধরেছেন খন্ড খন্ড নিত্যের নিরবহমান শব্দসভ্যতার মধ্যে দিয়ে আত্মার আত্মনির্মাণ, আত্মআবিস্কার ও ধাবমান স্বউন্মোচনের অভিযাত্রায় । ছায়া সমাজে শুধু ভাগ আর ভাগের চক্করে কার কোন সীমানা !
সেই সীমা ভাঙনের এক শৈল্পিক প্রত্যাশায় সুধাংশু সেন যা বলতে চান সেটি যেন ভস্ম ঘেঁটে উড়ে যাওয়া কনভেনশনের অতর্কিত ছোবল থেকে আলতো ভাবে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া ফিনিক্স পাখির অভ্যুদয় ও সম্যক অতিক্রমকারী ফ্রেম ভেঙে ফ্রেমের বাইরে ছড়িয়ে যাওয়া দিগন্তে এক ফোঁটা বিস্তারি রঙের মতো । যে চলাচল গভীর দ্যোতনাময় । অবক্ষয়ী সৌন্দর্য ও নান্দনিক তৎপরতার দ্বান্দ্বিকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, মানুষকে আপন শর্তে বেঁচে থাকার নিষিদ্ধ ভুবনে পা রাখার জন্য এক জনারণ্যে নির্জন কবি' র অব্যবহৃত ভাবনার শুদ্ধতাও বলা যেতে পারে ।
একসময় না সাহিত্য -- অল্প সাহিত্য -- না কবিতার নিরীক্ষা নিয়ে শুরু হয়েছিল
" নিমসাহিত্য আন্দোলনের” কাজ । যার পুরোধা পুরুষ ছিলেন কবি সুধাংশু সেন । না -- গল্পের কাজে এগিয়ে এসেছিলেন, রবীন্দ্র গুহ, বিমান চট্টোপাধ্যায়, মৃণাল বণিক । অত্যন্ত শক্তিশালী এই কবি ও লেখকেরা তাঁদের নামের প্রতি সুবিচার করে, আমাদের উপহার দিয়েছেন, বিভিন্ন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নানারকম গদ্য । সুধাংশু সেন, এমন সব কবিতা ও গদ্য আমাদের উপহার দিয়েছেন, যে গুলি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল কাজ হিসেবে চিহ্নিত ।
তবু কবিতা, প্রতিকবিতার বলয় অতিক্রম করে তিনিও কি সে ভাবে না -- কবিতা লিখেছিলেন ?বা, নিম সাহিত্য গোষ্ঠীর এজেন্ডা অনুযায়ী, তিনি কি শেষপর্যন্ত সেই লেখায় থাকতে পেরেছেন ?
এই প্রশ্ন একদিন আমি করেছিলাম, রবীন্দ্র দা ওরফে বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক রবীন্দ্র গুহকে । এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,” সত্যিই কি আমরা পেরেছি ? সুধাংশু পেরেছেন কি সেই অনির্দিষ্ট স্বপ্নের লক্ষে পৌঁছতে ?... পৃথিবী এখন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে দ্রুত সম্ভাবনাগুলো বাস্তবের আকার নিচ্ছে । যা ছিলো ভাবিত, তাই এখন ভবিষ্যতে স্বাভাবিক ।
পোস্ট কলোনিয়াল, পোস্ট মর্ডানিজম, পোস্ট মার্ক্সসিজম, নয়া উপনিবেশবাদ, বিচ্ছিন্নতা, নতুন বিশ্বব্যবস্থা, ফিউচারিজমের হাত ধরে এক অবিমিশ্র বিশ্বায়নব্যবস্থার কেন্দ্র ও প্রান্তের সংঘাতে একাকার হয়ে গেছে । দেরিদার মতে, গঠনবাদ যে সমগ্রের কথা বলে, তার সর্বদাই একটি কেন্দ্র থাকে । ঐ সমগ্রের অন্তর্গত চিহ্নগুলো একে ওপরের সাপেক্ষে অর্থবহ হওয়ার সময়ও প্রকৃতপক্ষে ঐ কেন্দ্রের ভাবনাকে মেনেই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে । যদিও এই কেন্দ্রকে কখনো সনাক্ত করা যায় না । দেরিদা তাই এক কেন্দ্রবিহীন গঠনে পৌঁছতে চান । বার্ত -- এর মতেও একটি আদর্শ পাঠকৃতি অজস্র চিহ্নকের সমষ্টি । চিহ্নকের গঠন দিয়ে একে বোঝা যাবে না । তাই একটি পাঠপ্রক্রিয়ায় ঢোকার অজস্র প্রবেশদ্বার থাকতে পারে । অতএব হয়তো আমরা পারি নি, না -- কবিতার ওপেন এন্ডেড দরজা পেরিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে । একটা মাঠ, একটা নিঃসঙ্গ তালগাছ, তার পেছনে সূর্যোদয় -- সূর্যাস্ত । ঝড় বৃষ্টি ও মেঘের খেলা । একটা নিঃসঙ্গ
তবুও গাছ । অন্যদিকে মঙ্গলগ্রহে বা চাঁদের কেনা জমিতে বিকল্প বাসস্থানের সন্ধান করছে, যাচ্ছে, দু এক দশকের মধ্যেই আমার নেক্সট জেনারেশন । তার হাতে আরো অনেক বিকল্প, উন্নততর ইন্টারনেট । উন্নততর অবিনির্মাণ । অল্টারনেটিভ ক্যাগনিশন ।
জবানি । ট্রান্সফর্মেশনাল জেনেরেটিভ গ্রামার ।
ন্যুভেলভাগ । প্লুরালিজমের নয়া ব্যাখ্যা । বাগর্থ তত্ব । কিংবা নতুন বিশ্বের শব্দার্থকোষ ।
অতএব, আমরা চেষ্টা করে হয়তো না -- কবিতা পারি নি । কিন্তু এক সম্ভাবনা জাগিয়েছিলাম, সেই সত্তরদশকে, কলকাতার বাইরে বসেই । সুধাংশু, সেই সম্ভাবনারই এক অকৃত্তিম অংশ ।
এটুকু মেনে নিতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই ।
এই অংশের শেষে, কবি সুধাংশু সেনের, শেষের দিকের কবিতার বই,”যেতে যেতে পথের সঙ্গে কথা," কবিতার বই থেকে কয়েকটি কবিতাংশ তুলে ধরছি.... যদিও তাঁর অসংখ্য কাজ এই কয়েকটি কবিতাংশ পড়ে কিছুই বোঝা যাবে না । তবুও এটুকুই আজ....
***” রাত্রিগুহা । সুডোল সৌন্দর্য্যের মুখে তলপেট সেঁকা ।
চারিদিকে দেয়াল । কোন কথা নয় ।
জানলার সাটার এঁটে দাও । রাত্রিগুহা,
যাকে চাই তাকে আগুনে পোড়াবো ।
চুলের সিঁথিচেরা পথ
ধরে মস্তিষ্কের দশ হাজার নিউরোন ।"
(আগুনে পোড়া দাগ)
***” তাঁর কবিতা সত্যিই কোনো ছকে ফেলা যায় নি -- মিডিয়া বিধৌত
এসময়ে তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন রেখে যাচ্ছেন,
তিনি হাঁটছেন, বলে ওঠেন, আমার প্রস্বর ছুঁড়ে দিও । মানিনী দেবীর দিকে” ( কি যেন বিঁধেছে ভিতরে )
***” আমিই তো সেই সূর্যের রশ্মির মতন,--
সীমান্তের ধার ঘেঁষে ল্যান্ডমাইন্স টপকে টপকে
ব্যান্ড বাজিয়ে গেলো মেষ বালকেরা ।”
(একুশ শতক, এই ভোর )
***” প্রখর রাত্রির বুকে স্বাতী নক্ষত্রের আলোয় হাঁটছেন কবি, নীচে পথ । আমরা হাঁটছি সামনের দিকে -- আমাদের মুখগুলো পিছনে ঘুরোনো রয়েছে -- অজস্র মৃত্যুর পর আরও মৃত্যুর মুখ ---তবুও দেখে নিতে চান সুপ্তবীজের স্বপ্ন । হৃদয়ে বরফ জমা কুয়াশা -- আগুন বুকে নিয়ে ফসলের উৎসবে দীর্ঘ শীত রাত পেরিয়ে” -- ( এ আমাদের স্বকাল যাত্রা )
***” একটা রাস্তা ধরে আমি হাঁটছি
রাতের ঘুমের মধ্যে কুয়াশার পথ
পথের দুধারে ভগ্ন মনস্তাপ ছোটো ছোটো ছাউনি
গরুর গাড়ির চাকা, মানুষের ফাঁপা -- হাড়,
ছায়াবিভক্ত সমাজে -- ঠিক কি ডোডোদের
মতো ? (কনভেনশন, ২০০০)
***” তাহলে বিশ্বায়ন, তুমি গিন্সবার্গ থেকে
সবচে উত্তেজক যৌন কিছু পাঠ করো ।”
(তুষার ঝরা রাতের গল্প)
***” জলে সীগ্যালের ছায়া মিলিয়ে যেতে
ছিঁড়ে খাচ্ছে বই, আমার খোলা বইয়ের পাতা ।
কাকে ধরি হাওয়ার সমুদ্র !” (হাওয়ার সমুদ্রের দিকে)
***” এসো, আবার আমাদের যাত্রা শুরু করা যাক
শেষ রাতের তারারা বলাবলি করছে -- একটু একটু সরে যেতে যেতে কিন্তু আমরা এ মুহূর্তে কোন দিকে যাবো ?
এসো, সূর্য -- পাহাড়ে যাই দেখে আসি
হয়তো দুডানাঅলা ঘোড়ারা প্রাতঃকালীন চা -- বাগানে বসেছে”
(দু ডানাঅলা ঘোড়াদের বিষয়ে)
❑ কবিতার কথা: সাত ❑
এক
ময়ূর পাখায় চাঁদ
.....................
ময়ূর পাখায় চাঁদ কবিতায় কবি তারক সেন লিখেছিলেন
"ইতিহাসের পাতা ছিঁড়ে, কবিতার খাতা ছিঁড়ে,
বাণ মেরে, যেমন করেই হোক
জল নিয়ে এসো গাঁয়ের জন্যে
বিভ্রান্ত রক্তপাতের পর অভ্রান্ত বৃষ্টিপাতের জন্যে
তোমরা নতুন মেঘের মতো সংঘবদ্ধ হও চারিদিকে
ছাঁচার জলে বান ডেকে যাক বাঁচার ।
আমরা মেয়ে বেচতে যাবো না কোলকাতায়
কোলকাতা কিনে আনবো মেয়ের বিয়েতে "
গ্রাম, মফস্ব, সেমি টাউন দিয়ে কলকাতার সাহিত্য ও কবিতাকে একটা পরোক্ষ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে
ছিলো বেশ কিছু নয়ের দশকের পত্রিকা এবং কবি ।

আমি মনে করি সবসময়, বাংলা কবিতা ও গদ্যের ইতিহাস অস্বচ্ছ এবং অসম্পূর্ণ যদি না, কোলকাতা বহির্ভূত সমস্ত বঙ্গের কবিতা ও গদ্য নিয়ে চর্চাগুলোকে পুরোপুরি তুলে ধরা না হয় ।
বহুল প্রচারিত বাণিজ্যিক পত্রিকাগোষ্ঠীর প্রসাদপ্রার্থী হয়ে বহু লিটল ম্যাগের সম্পাদক ও লেখক কেবল নামি বাণিজ্যিক পত্রিকার দাক্ষিণ্য পাবার জন্য পত্রিকা করে থাকেন । কেবল নামী কবির তল্পি বাহক
হবার জন্য, তাঁদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও চালিত হয়ে খুশিতে থাকেন তারা । কেবল নামী পত্রিকায় কয়েকটি লেখা ছাপিয়ে তাদের দৌড় থেমে যায় । বাণিজ্যিক পত্রিকার সফল কবি ও পত্রিকা গোষ্ঠীর তালেবররা ভাবেন, কারখানার দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের নেতাকে ঘুষ দিয়ে কিনে নিলেই আন্দোলন শেষ হয়ে যায় । এবং এই আশ্চর্য ভাবনাকে ইন্ধন জুগিয়ে সেই সব শৃগালেরা, অর্থাৎ লিটল ম্যাগের তথাকথিত সম্পাদকেরা ভাবেন আর পরম আত্মঅহমিকায় গর্বিত হন, উপেক্ষা করেন, প্রকৃত বাংলা কবিতা ও গদ্যের নিরীক্ষামূলক কাজগুলিকে ।
কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয় । তোতাকাহিনী গল্পের নিন্দুক বনের আড়াল থেকে বেরিয়ে একসময় রাজামশাইকে বলে,
" পাখিটাকে কী দেখেছেন মহারাজ! "...
বাংলা কবিতার ৬০ দশকে, কবিতা ও গদ্যের যে আন্দোলনগুলো হয়েছিল, তার তুমুল পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল পরবর্তী দশকগুলোতে বেশ কিছু পত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করে, কতিপয় কবি ও গদ্যকারের মধ্যে । জামশেদপুর থেকে কৌরব পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এর চর্চা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত উৎসাহী, নতুন নিরীক্ষামূলক কাজে অনুসন্ধিৎসু তরুণ কবিদের মধ্যে । কোলকাতায় বসেও একদম ভিন্ন ঘরানার কাজ করতে থাকে, কবিতা পাক্ষিক,
কবিতা ক্যাম্পাস, আলাপ...এই সমস্ত পত্রিকাগুলো । শ্যামলবরণ সাহার উৎসাহে, বাকচর্চার কবিরা উৎসাহী হয়ে পড়েন একটি পত্রিকায় নতুন কিছু কাজ করার নেশায় । পত্রিকাটির নাম, বাল্মীকি । প্রতিষ্ঠানবিরোধী যে যে আন্দোলনগুলো একসময় আলোচনার বিষয় ছিলো ৬০-- এর দশকে, হাংরি, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, থার্ড লিটারেচার কিংবা সত্তর দশকে নিমগোষ্ঠীর, নিম সাহিত্য আন্দোলন...এরকম ভাবেই ১৯৮৯ এর সেপ্টেম্বর মাসে কৃষ্ণনগরে একটি প্রতিষ্ঠান বিরোধী সম্মেলন হয় । দুদিন ধরে আলোচনা, আলাপ, বিতর্ক চলেছিল । এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী একটি ইস্তেহার প্রকাশ করা হয়, " শতজলঝর্ণার ধ্বনি " নাম নিয়ে । এই সম্মেলনের মূল দায়িত্ব ছিলো
" পুনর্বসু " পত্রিকা । এই নামকরণটি জীবনানন্দ দাশের সৌজন্যে দিয়েছিলেন, কবি নির্মল
হালদার । মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত, গৌতম চৌধুরী, স্বপনকান্তি ঘোষ, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় । স্থানীয় ভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, কবি দেবদাস আচার্য ও সঞ্জীব প্রামাণিক । বাংলার সেইসময় তাবড় কবিরা সেই অ
নুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন । সেই সম্মেলন থেকে যে ইস্তেহারটি বেরোয় তাতে যা যা বলা হয়, তার দু একটি হলো,
এক. কোনও সৃষ্টিশীল লেখক ও কবি, যাঁর দায় সময় ও মানুষের কাছে -- তিনি কোন ধরণের প্রতিষ্ঠানের ঔদ্ধত্ব্যকে মেনে নেবেন না ।
দুই. প্রতিষ্ঠানের পণ্য -- সাহিত্যিকের উল্টোদিকেই আজ দাঁড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য -- অজস্র ছোটো ছোটো পত্রিকায়, প্রকৃত পাঠকদের কাছে এই সব পত্র পত্রিকা আরও বেশি বেশি করে পৌঁছে দিতে হবে...
এভাবেই, দুটি ইস্তেহারে বলা হয়, বাজারমুখী বাণিজ্যিক পত্রিকা যদি কাব্য সাহিত্যের নিয়ন্ত্রক হয় তাহলে তাদের মনোভাব হয়ে ওঠে স্বৈরাচারীর মতো । এই বাণিজ্যিক কুশলী চাল থেকে প্রকৃত কবি সাহিত্যিকদের আলাদা করা ও আলাদা রাখাই একমাত্র উদ্দেশ্যে হওয়া উচিৎ । কিংবা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শত্রু ও মিত্রদের ব্যবধান প্রসারিত হোক । ইত্যাদি ইত্যাদি । এবং এই সম্মলেনের পরবর্তী অনুষ্ঠান হয়, বীরভূমের সিউড়িতে
। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ ।
আয়োজন করেছিলেন " মধ্যরাত্রি " পত্রিকার সম্পাদক, সৈয়দ সমিদুল আলম । প্রতিষ্ঠান বিরোধী সম্মেলন ও শতজলঝর্ণারধ্বনি, সংকলন প্রকাশের পর, অজস্র লেখালেখি হতে থাকে সারা পশ্চিমবঙ্গে । প্রচুর অবান্তর কথার মধ্যে, অরুণেশ ঘোষ, নিতাই জানা, দেবদাস আচার্য, বারীন ঘোষালের লেখা পড়ে সত্যিই সমীহ জাগে । এবং এঁদের কথা ভাবনা আর কবিতা যাপনে কোনোদিন কোনও অসততা আমরা লক্ষ করি নি ।
কিন্তু সেই সম্মেলনে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে কেবল বিশেষ বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিখে ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসারী চামচে তৈরী করে নিতে চূড়ান্ত সফল হয়েছিলেন । দুর্ভাগ্য, অধিকাংশ প্রচারপ্রিয় অলস ও কবিতা বা সাহিত্যকে টাইম পাস্ ভেবে কাটানো পাঠক খোঁজেন না আসল সাহিত্যের হাল হকিকত । যাঁরা খোঁজেন তাঁরাই জানেন, চোখে দেখা আর বহুল প্রচারের বাইরেও আছে একটি সমান্তরাল বাংলা কবিতার ভুবন ।,যার ঐশ্বর্য্য আন্তর্জাতিক ক্ষমতায় অম্লান । যদিও সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন কবি ও খোলামেলা মনের মানুষ সুব্রত সরকার । সুব্রত দা আন্তরিক ভাবেই চেয়েছিলেন এই স্বচ্ছ অবস্থানকে মান্যতা দিতে । যদিও সেই অনুষ্ঠানে সুব্রত দা, অকপটে জানিয়েছিলেন তিনি একটি পত্রিকায় ফিচার লেখেন, এবং তিনি কি করবেন । সবাই তাতে আপত্তি জানায় না । কিন্তু একটি লেখায় পড়েছি, প্রতক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে যে, পার্থ দেব এবং দুএকজন ফালতু লোক, ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি, শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়কে নানাকারণে ব্যক্তিগত জায়গায় তারা আক্রমণ কর
ছিলেন ও উত্যক্ত করছিলেন, সেইসময় কবি সুব্রত সরকার তীব্রভাবে তার প্রতিবাদ করেন । এই সততার জন্যই কবি সুব্রত সরকারকে আমার আজও ভালো লাগে । যদিও একসময় কুরুক্ষেত্র পত্রিকার জন্য কবিতা চেয়ে তাঁর কাছে পোস্টকার্ড পাঠালে তিনি তখন রেস্পন্স করেন নি । হয়তো যোগ্য মনে করেন নি । কিন্তু পরে তিনিই, আমাদের একটি অনুষ্ঠান হয়, গড়িয়াহাটের শরৎচন্দ্রের বাসভবনে । সেই অনুষ্ঠানে, কুরুক্ষেত্র পত্রিকার তরফ থেকে কবি রঞ্জিত সিংহকে সংবর্ধনা দিই । সেই অনুষ্ঠানে এসে সুব্রত দা, সমস্ত অনুষ্ঠানে আমাদের সঙ্গে আন্তরিক ভাবে ছিলেন । তাঁর সেই ঔদার্য্য আমরা আজও ভুলি নি...
যাইহোক আমার এই লেখাটা, শতজলঝর্ণারধ্বনির, ইস্তেহার নিয়ে নয় । আমার বলার বিষয় হলো আমাদের পত্রিকা কুরুক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে, কিছু কাজ, কিছু কবি ও লেখালিখির নতুনত্ব নিয়ে অন্বেষণ । কথা প্রসঙ্গে এই সব আন্দোলনের অভিমুখীকরণ নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু কিছু বলবো ।

তো, যা দিয়ে শুরু করেছিলাম । নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পত্রিকা । এই পত্রিকায় আমরা প্রথমে ছিলাম তিন জন । আমি, স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায় এবং শিল্পী সঞ্জয় রক্ষিত । আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যে ছিলো, নানারকম সঞ্জয়ের নিরীক্ষামূলক দুর্দান্ত লিনোকাটের কাজগুলো সহ, সমান্তরাল বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র কবিদের কবিতা, সমকালীন সময়ে, অর্থাৎ নয়ের দশকে কোন কোন কবি নতুন ধরণের কাজ করছেন, তাঁদের লেখা খুঁজে বের করা, পাশাপাশি সিরিয়াস গদ্য ও অনুবাদের কাজকরা । নানারকমের লিটল ম্যাগ দেখতে প্রায় যেতাম কলেজস্ট্রিটের পাতিরামে । পাশাপাশি সেই সময় কবি আনিসকল্যাণ ( ছদ্মনাম ) বা দীনেশ চট্টোপাধ্যায়ের দমদমের বাড়িতে থেকে কোলকাতায় কাজ করতো স্নেহাশিস । সেইসময় দীনেশ বাবু ও সত্য গুহ ' র কাছে আমরা নানান রকম পরামর্শ পাই । পাশাপাশি, সমকালীন সময়ের কবি বন্ধুদের অন্য ধরণের লেখার খোঁজে প্রায় চলে যেতাম তাদের বাড়িতে । সে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, আসানসোল, কাকদ্বীপ, বনগাঁ, বসিরহাট, রানাঘাট, শিমুরালি, চাকদা, পায়রা ডাঙা, বাঁশবেড়িয়া, সুখচর হোক বা অন্য কোথাও । এমনও দিন গেছে, সকালে কবি বন্ধুকে ঘুমন্ত অবস্থায় মশারির থেকে বের করে লেখা কপি করে নিয়ে এসেছি । এই বন্ধুটির নাম, সাম্যব্রত জোয়ারদার । কখনও আবার, গামছা পরে, মাটির চালার নীচে বসে, খালি গায়ে কবিতা কপি করেছে অন্তরঙ্গ বন্ধু বনগাঁয় বিভাস রায়চৌধুরী । সপ্তর্ষি হোর, অর্ঘ্য মন্ডল । মাইলের পর মাইল শীতের সর্ষে খেত পেরিয়ে একদল তরুণ কবি দিগন্তের কাছে ছুটে যাচ্ছে, সূর্যাস্তের দেশে...এ দৃশ্য নিশ্চই মনে আছে বিভাসের । মনে আছে একবার তখন গিয়েছিলাম, পথের পাঁচালি সেবা সমিতির প্রধান, শ্রদ্ধেয় জগন্নাথ লালার কাছে ।
যাই হোক, এই সময় কুরুক্ষেত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করে পেয়েছিলাম অনেক বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিককে । আমাদের কাজে আদ্যন্ত সহায়ক ছিলেন, মানবেন্দু রায় । তাঁর সহযোগিতা না পেলে, আমাদের সমস্ত কর্মসূচি সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হতো না । পেয়েছিলাম কবি বিমান মাজি, দিশারী মুখোপাধ্যায়, সুকমল ঘোষ, কল্যাণী লাহিড়ী, পিনাকী রঞ্জন সামন্ত, ব্রজকুমার সরকার, বিকাশ গায়েন, কল্লোল শ্রী মজুমদার, কবি শক্তি সেনগুপ্ত, শিল্পী স্বপন ঘোষ, অনিকেত পাত্র, রজতশুভ্র গুপ্ত, সুধাংশু সেন, রথীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বারীন ঘোষাল, জহর সেন মজুমদার, ধীমান চক্রবর্তী, অশোক মজুমদার, সুমিতা নন্দী, রূপক দাস, সুবীর ঘোষ, শিখা সামন্ত, বিষ্ণু সামন্ত, প্রকাশ দাশ,সৌম্য দত্ত, অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর ও কবি রঞ্জন ঘোষাল, কবি মতি মুখোপাধ্যায়, প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিকদের সহযোগিতা । নানা সময় লেখা ও ছবি এঁকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন বিশিষ্ট কবি ও শিল্পী শ্যামলবরণ সাহা এবং অবশ্যই এই কবির ঘরণী ও বিশিষ্ট কবি, সঞ্চয়িতা কুন্ডু ।
তারুণ্যের দিনগুলোতে চোখে ছিলো স্বপ্ন এবং কিছু করার তীব্র ইচ্ছে ।

আমাদের পত্রিকার জন্য আমরা সাধ্যমতো বিজ্ঞাপণ জোগাড় কর তাম । যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম । টিউশনি করে বা ছোটো ছোটো ব্যক্তিগত
সাহায্য নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম মন প্রাণ খুলে । পত্রিকা প্রকাশের পর, একসময় দূর্গাপুর টাউনশিপের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আমি আর স্নেহাশিস পত্রিকা বিক্রি করেছি । এসব কাজ করতে করতেই একটি পরিকল্পনা মাথায় এলো । " তিন কবির মুখোমুখি " বলে একটি অনুষ্ঠানের । দুর্গাপুরের একজন, জেলার একজন এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যধারার কাজ করেন এমন একজন বিশিষ্ট কবিকে নিয়ে, ঘরোয়া অনুষ্ঠানের । এই অনুষ্ঠান হতো, কোনও উৎসাহী সাহিত্য প্রেমীর বাড়িতে । পঞ্চাশ জন পাঠকের কথা ভেবে আমরা একটা লিফলেট ছাপাতাম ।
যেখানে তিন কবির সংক্ষিপ্ত পরিচয় থাকতো । অনুষ্ঠানের শুরুতেই পাঠকদের হাতে তুলে দিতাম সেই পরিচয়পত্র । কবিরা এক এক জন করে কবিতা পড়তেন । এবং কবিতা পড়া শেষ হলে, উপস্থিত পাঠক ও শ্রোতারা প্রশ্ন করতেন কবিকে । এবং নিজের লেখালিখির বিভিন্ন দিক. নিয়ে কথা বলতেন কবিরা । এই অনুষ্ঠান অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল । প্রায় কুড়িটা এরকম অনুষ্ঠান করেছিলাম । অবাক হই ভেবে, প্রথমবার এক আনকোড়া পত্রিকার আনকোড়া তরুণ সম্পাদকের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন বিশিষ্ট কবি, দেবদাস আচার্য ।
এক বর্ষণঘন বিকেলে, কৃষ্ণনগর অরবিন্দ স্টেডিয়ামের কাছে, কবি দেবদাস আচার্য্যের বাড়িতে গিয়েছিলাম খুঁজে খুঁজে । আচার্য্যের ভদ্রাসনে বসা এই মিতবাক ও গভীর মনের মানুষটি তাঁর বাড়িতে প্রথমবারই আমাকে দেখে নিরাশ করেন নি । একজন প্রায় অখ্যাত যৎসামান্য তরুণের সঙ্গে তিনি সেদিন প্রচুর গল্প. করেছিলেন এবং কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত সরপুরিয়া আর বিরাট সাইজের রাজভোগ দিয়ে জোর করে বসিয়ে খাইয়েছিলেন । আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, আমার প্রস্তাব শুনে, কোনও কিছু না ভেবে তিনি যেতেও রাজি হলেন ! নির্দিষ্ট দিনে, কৃষ্ণনগর থেকে বাসে দুর্গাপুরে চলে এলেন কবি দেবদাস আচার্য । ওনাকে দুপুরে কোথায় খাওয়াবো এবং অনুষ্ঠান কার বাড়িতে করবো, তাই নিয়ে চিন্তার শেষ ছিলো না । দুম করে একটা ভাবনা তো এলো, কিন্তু তাকে বাস্তবায়ন করা যে কী সমস্যার হঠাৎ বুঝতে পারলাম । তো সেই সংকটকালীন অবস্থায় আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন আদ্যন্ত বামপন্থি কবি আবৃত্তিকার আর নাট্যব্যক্তিত্ব, সুকমল ঘোষ । তিনিই তাঁর স্কুটারে করে দেবদাস দা কে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে । দুপুরে কয়েকঘন্টা বিশ্রাম এমনকি রাতেও থাকার জায়গা, খাবার ব্যবস্থা সব করলেন সুকমল দা । বিনা পয়সায় লিফলেট ছেপে দিলেন, মানবেন্দু রায় । অনুষ্ঠান হলো এক উৎসাহী সাহিত্যপ্রেমীর বাংলো বাড়িতে । তিনি ছিলেন ডি পি এল কারখানার সিনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার । প্রথমবার অনুষ্ঠানে ছিলেন দুজন কবি । দেবদাস আচার্য ও. বিমান মাজি । অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন, কবি বিকাশ গায়েন । এবং উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীদের সিঙাড়া ও চা সরবরাহ করেছিলেন স্বহৃদয় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব । দুর্ভাগ্য, তাঁর নামটি এখন মনে পড়ছে না । অনুষ্ঠানে প্রায় সত্তর পঁচাত্তর জন মানুষ এসেছিলেন সোৎসাহে । অনুষ্ঠান, প্রথমবারই হয়েছিল গ্রান্ড সাকসেস । আমার আর স্নেহাশিসের চোখে আনন্দাশ্রু । সেদিন সেই প্রথমবার শুনেছিলাম কবি দেবদাস আচার্য্যের স্বকণ্ঠে কবিতা এবং অকপট অন্তরঙ্গ আলাপন । কবি বিমান মাজিও কম যান না । তিনিও প্রচুর উৎকৃষ্ট কবিতা পড়েছিলেন সেদিন ।
কবি বিমান মাজি, আমার চোখে দেখা এক অদ্ভুত কবি ব্যক্তিত্ব । একসময় কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র, প্রায় বলতেন উত্তরাধুনিক কবিতার অমিতাভ গুপ্তের কথা । কি ভাবে তিনি কফি হাউস মাতিয়ে রাখতেন সেই কথা । লেখালিখির শুরুতে, প্রায় সবসময় অমূল্য উপদেশ ও কিভাবে নিজের লেখাকে ডেভেলপ করা যায় সেই ব্যাপারে অমূল্য সাহচর্য পেয়েছি তাঁর । বিমান দা ছিলেন প্রকৃত শিক্ষিত এবং মৃদুভাষী রসিক । আমাকে আর স্নেহাশিসকে তিনি অভিভাবকের মতো আগলিয়ে রাখতেন । বাংলা কবিতার ছন্দ ও মিথকে ব্যবহার করে, তিনি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট কবিতা লিখতেন । কোনও দিক থেকেই, তাঁর সমকালীন বাংলা কবিতার প্রধান কবিদের থেকে তিনি লেখায় পিছিয়ে ছিলেন না । কিন্তু আদ্যন্ত প্রচার বিমুখ । তাঁর কবিতা বইগুলোর নাম যথাক্রমে, করাঙ্গুলি নিষিদ্ধ টিলায়
(১৯৯১), একটি অসমাপ্ত চিত্রনাট্য ( ১৯৯৪ ), ছিন্নকুশ ও অভিষুত সোম (২০০১ ), উত্তর চর্যাগীতি ( ২০০৪ ), হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব (২০০৫) প্রভৃতি । বিমান দা অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন এক প্রতিবাদী মানুষ । সমকালীন সময়ে দেশ ও বিশ্বের নানারকম ঘটনা ও প্রেক্ষিতকে অবলম্বন করে তিনি নানারকম মিথের মাধ্যমে কবিতাকে এক অনিঃশেষ উচ্চতায় তুলে ধরতেন । তিনি মনে করতেন, স্বদেশ ও স্বকালে দাঁড়িয়ে সামাজিক মানুষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য থেকে, তাঁদের চেতনা ও উপলব্ধির জগৎকে আলোকিত ও প্রশ্ন ব্যাকুল করে তোলাই কবির কাজ । বিমান দা ছিলেন আদ্যন্ত কবি । অথচ আবেগপ্রবণ ব্যক্তি।অনেক পরস্পর বিরোধী আচরণ, অবদমিত আবেগের বহুরৈখিক প্রকাশ মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসতো অন্তরঙ্গ মানুষদের কাছে । নিজের কৃতি দুই সন্তানকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে লালন করেছেন, দূর্গাপুর ইস্পাত কারখানার স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন এবং অনেকসময় অনেকের মতো, অনেক তথ্য যাচাই না করে কাছের মানুষদের ভুল ও ঠিক বুঝেছেন । তিনি ছিলেন ছিলেন বললাম । কিন্তু তিনি এখনো যথেষ্ট সুস্থ অবস্থায় সাহিত্য কর্মে ব্যস্ত । যদিও নানান কারণে দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই । আজ থেকে প্রায় পনেরো ষোলো বছর আগে লেখা একটি কবিতা তাঁর, যা আমাদের কুরুক্ষেত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, সেই কবিতাটি তুলে ধরে পাঠকদের দেখাচ্ছি, সেই কবিতা বর্তমান ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষায় আজও কতো প্রাসঙ্গিক...

প্রথম সর্গ
.............
মেঘিভূঁই লিটল ম্যাগের পক্ষ থেকে রবীন্দ্র পরিষদে
আষাঢ়ের প্রথম দিনের কবিতাপাঠের যে আয়োজন,
তদুপলক্ষে বাংলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন
আমাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন ।
পূর্বমেঘে কবি কালিদাস বিমান -- মনোরমা
মেঘের যাত্রাপথের বর্ণনা দিয়েছেন,
আমার এই সাক্ষাৎকারও এক মনোরম কবি কল্পনামাত্র...
দ্বিতীয় সর্গ
..............
আই হেট্ রাম এন্ড হিজ ৱ্যাবলস -- আপনার রচিত শ্রেষ্ট পংক্তি ।
রামরাজ্যের বাস্তবতা সম্পর্কে আপনার যথাযত ধারণা থাকলে
মেঘনাদবধ কাব্যে বৈদেহী কমপক্ষে বার দশেক ধর্ষিতা হতেন ।
আপনি স্বীকার করবেন, শুধু রাক্ষসরা নয়,বানরবৃন্দও
সমান ধর্ষণের্চ্ছুক ও কামুক । হিরোহোন্ডারোহী ব্লাডি মাঙ্কিজ
অযোধ্যা থেকে বাংলা সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ।
দে হ্যাভ কিকড নট ওনলি ইওর ফেবারিট ইন্দ্রজিৎ
বাট অল্সো রাম এন্ড লক্ষ্মণ সহ বাল্মীকির সমস্ত আদর্শ ও মূল্যবোধ ।
এই মাঙ্কিজদের রূপ ও প্রকৃতি বর্ণনার উপযুক্ত কাব্যভাষা আমাদের নেই ।
এদের নিয়ে একমাত্র আপনিই পারেন পয়ার,ত্রিপদী ও মাত্রাবৃত্ত ভেঙে
কোনো স্বাধীন অমিত্রাক্ষরে এক অভিনব
বানরসম্ভবকাব্য রচনা করতে ।
ফর ইওর কাইন্ড কো অপারেশন উইদ মেঘিভূঁই,
থ্যাংকইউ স্যার !
( বানরসম্ভব কাব্য / বিমান মাজি )
দীর্ঘ ষোলো বছর আগে লেখা এই লেখাটি আজ মনে হয় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক । মনে পড়ে একই আসরে দুই কবির কবিতা পাঠের শেষে ভূয়সী প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন কবি বিমান মাজিকে, কবি দেবদাস আচার্য ।
দেবদাস দা, আমাদের কুরুক্ষেত্র অনুষ্ঠানে অনেক কবিতা পড়েছিলেন ওনার কালক্রম ও প্রতিধ্বনি, মৃৎশকট, মানুষের মূর্তি, ঠুঁটো জগন্নাথ, উৎসবীজ, আচার্যর ভদ্রাসন, তর্পণ, অনুসূচিত কবিতা...প্রভৃতি কবিতার বই থেকে ।
শেষে, সুন্দর হস্তাক্ষরে সেই সময় অপ্রকাশিত একটি কবিতা আমাকে উপহার দেন । যেটি কুরুক্ষেত্র পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিল । কবিতাটি এখানে তুলে ধরছি...
" কোনো পাপ আর মানুষকে স্পর্শ করবে না
কোনো ঈশ্বর আর অপেক্ষা করবে না পুণ্যাত্মার জন্যে
নরকের দরজা আমি বন্ধ দেখে এলাম
পাপ পুণ্য স্বর্গ নরক এইসব শব্দগুলির প্রতি আমি কৃতজ্ঞ
এরা দীর্ঘকাল আমার অজ্ঞতাকে বহন করেছে
আজ আমি এদের ছুটি দিলাম
ওই পাথরের মূর্তি যিনি দীর্ঘকাল আমাদের চিত্তের প্রশাসক ছিলেন
তাকেও আমি ছুটি দিলাম অন্য কোনো নক্ষত্র খুঁজে নেওয়ার জন্যে
আজ মনে হয়, জনপদের মিশ্রধ্বনিময় এক গান থেকে উঠে আসছি আমি "
(জরথ্রুষ্ট বলেন / দেবদাস আচার্য )
সেই প্রথম লেখালিখির যুগে, কবি দেবদাস আচার্য্যের যে বিশাল মানবিক একটি মনের পরিচয় পেয়েছিলাম, যিনি আদ্যন্ত কবি -- সাধক, নিজের ভদ্রাসনে বসেও সবার সঙ্গে নিবিড় ও অন্তরঙ্গ সখ্য হয়ে উঠতে পারেন । কবি দেবদাস দা তো বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি, কিন্তু মানুষ দেবদাস দা র সততা ও বড়ো মন আমাকে ঋদ্ধ করেছিলো, ভবিষ্যতের পাথেয় হিসেবে...
দুই .
আলোর কথা অন্ধকারের কথা
....................................
ওপরের নামকরণটি কবি রজতশুভ্র গুপ্তের একটি কবিতার নাম ।
মনে পড়ে রজত দা কে । সুঠাম দীর্ঘদেহী কৃষ্ণবর্ণ সবসময় মুখে শালপাতার চুরুট অর্থাৎ জ্বলন্ত বিড়ি । অক্লান্ত পরিশ্রমী, কবিতার উন্মাদ, বয়স্ক বালক, রসবোধে রসিক চূড়ামণি এই অতি সুভদ্র মানুষটি । মাইলের পর মাইল তিনি তাঁর বিখ্যাত, সুবোধ ঘোষের ছোটো গল্প, অযান্ত্রিকের, জগদ্দলের মতো সাইকেল নিয়ে আমাদের শিল্পশহর দূর্গাপুর চোষে বেড়াতেন । আমার বাড়িতে হামেশাই প্রায় পনেরো কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আসতেন, ওনার নতুন কবিতা শোনাতে । একটু মোটা ডিপ নীল কালিতে লেখা, অত্যন্ত সুন্দর হাতের লেখায় সমৃদ্ধ ওনার কবিতার ডাইরি । যদিও এই আদ্যন্ত বাগানপ্রিয় রোম্যান্টিক মানুষটি তাঁর প্রায় সব দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে অতি হাস্যকর একটি ছেলেমানুষি যুক্তি দিতেন । যা শুনে আমি ও কবি এবং ত্রিস্টুপ পত্রিকার সম্পাদক আমার আদ্যন্ত বন্ধু, দাদা ব্রজকুমার সরকার খুব মজা পেতাম ।
"রজত দা, দাঁত বাধাঁন না কেন ?...
--- আর বলো না, চিড়ে আমার খুব প্রিয় । চিড়ে খেয়ে খেয়ে আমার এসিড হয়ে সব দাঁত পড়ে গেছে । আর বাঁধিয়ে কি হবে !
এই অত্যাশ্চর্য কথা শুনে আমি ও ব্রজ দা খুবই পিছনে লাগতাম রজত দা' র । রজত দা ' র সঙ্গে ব্রজ ' র আবার অম্ল মধুর ঝগড়া হতো । যা আমার কাছে একটি নান্দনিক উপভোগের বিষয় ছিলো । কবি প্রভাত চৌধুরী, সেই সময় সাড়া বাংলা জুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন, কবিতা পাক্ষিক পত্রিকার মাধ্যমে । কোলকাতায় থাকলেও তিনি ছিলেন আছেন আদ্যন্ত বাঁকুড়ার মানুষ । অত্যন্ত রসিক সদালাপী প্রভাত দা র লেখালিখির দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়েছিল, তাঁরই সম্পাদনায় কবিতা পাক্ষিকের মাধ্যমে । যদিও তাঁর সহকারী, সুভদ্র ও বিশিষ্ট কবি, নাসের হোসেন বা অর্জুন মিশ্রের নাম আমরা অস্বীকার করবো কিভাবে ! দুজনের শ্রমে তিতিক্ষায় দাঁড় করিয়েছিলেন নব্বই দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই পত্রিকাটি । নব্বই দশকের এমন কোনও কবি নেই যিনি কবিতা পাক্ষিকে লেখেন নি ।
তো এই কবিতা পাক্ষিক পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ফুলফর্মে লিখতে শুরু করেন রজতশুভ্র । তিনি কবিতা পাক্ষিক পত্রিকাকে সন্তানতুল্য মনে করতেন । শিল্পশহরে এই পত্রিকাকে তরুণ কবিদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য তিনি ছিলেন প্রধান যোগসূত্র । এইসময় আমরা প্রায় সবাই, মানে আমি, রজত দা, পিনাকীরঞ্জন, রথীন, ব্রজ দা, স্নেহাশিস, কল্লোলশ্রী, প্রায় সবাই নিয়মিত কবিতা পাক্ষিকে লেখালিখি করতাম ।
কবিতা পাক্ষিকের জন্য অক্লান্ত শ্রম দিতেন রজত দা । এবং এই পত্রিকা তাঁর অধিকার মনে করতেন । তাঁর সেই নির্লোভ আদ্যন্ত কবিতা প্রেমী মনোভাবকে আমার খুবই ভালো লাগতো ।
রজত দা র কবিতায় আমরা পেয়েছি এক বিষণ্ণ প্রেমিক যিনি পোস্টমর্ডান কালসীমায় দাঁড়িয়েও প্রায় টানা গদ্যের আঙ্গিকে এক পরাবাস্তব জগতের সঙ্গে মিশিয়ে দিতেন কাল্পনিক অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম ও গহন চলাচলকে । এক উদাসী ব্যথিত ভ্রামণিক মানুষকে পাই তাঁর লেখায়, যে স্বপ্ন অলীক হয়েও অলীক নয় । যে স্বপ্ন কবির নিজস্ব পৃথিবীর শূন্যতাকে একটু একটু করে মন রঙে ভরিয়ে তোলে স্ফূর্ত ভালোবাসায় । এ এমন অসুখ, যে রোগ একান্তে বহন করে সৎ কবির নির্লোভ সত্তা । আঘাতপ্রাপ্ত, বেদনাহত, ব্যর্থ অথচ স্বপ্নের সম্ভারে দ্বিতীয় ভুবনের টানে যে ছুটে চলে কবিতার বিক্ষত ছায়ায় অপার শ্রমণ হয়ে ।
রজত দা র শেষ জীবনটা খুব খারাপ কেটেছিল । অর্থকষ্টে, নানান অসুখে ভুগে ক্রমে একা হয়ে যাওয়া এই অসহায় অকাল প্রয়াত বিশিষ্ট কবি ও প্রিয় মানুষটার জন্য, আজ কেবল বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে...!
আমি কবি রজতশুভ্র গুপ্তকে কবি হিসেবে যথেষ্ট শক্তিশালী কবিই মনে করে এসেছি । আজ অনেক বছর হয়ে গেছে । মনে হয়, তাঁর একটি কবিতা সংগ্রহ যদি প্রকাশ পেতো তো ভালো হতো । শ্রদ্ধেয় প্রভাত চৌধুরী এবং কবিতা পাক্ষিকের কাছে আমার অনুরোধ যদি তাঁরা তাঁদের প্রকাশনী থেকে এটি করেন তো খুব ভালো হয় । আমি আজ পরপর তিনটে কবিতা এখানে রাখছি, কবি রজতশুভ্র গুপ্তের । যে তিনটে কবিতা সদ্য লেখার পর আমাকে শুনিয়েছিলেন কবি স্বকণ্ঠে । পরে সেগুলো প্রভাত চৌধুরী সম্পাদিত, পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতায় আমরা পাই...
আলোর কথা অন্ধকারের কথা
....................................
তুমি অস্পষ্ট হলেই বনের ভেতর পেসেন্স খেলতে শুরু করি
ভীষণ হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে রাজা পাশেই বৃক্ষশাখায়
বসে জোকার হাসছে, তছনছ করে দিই খেলা,
অমনি গাছ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে সাদা দুঃখ, কালো হয়ে আসে সৌম্য বিকেল,
একটু পরেই রাত গ্রাস করবে প্রতিটি রেশম সবুজ, জেনে গেছে,
দীর্ঘদিন এখানে আলো জ্বলে না ।
জ্যাকেট বিষয়ক
.....................
আমার নীল জ্যাকেট থেকে ছড়িয়ে পড়ে কিছু অন্তরঙ্গ লণ্ঠনের আলো আর সেই আলোর বিশ্বস্ততা ভূমন্ডলের সমস্ত চাপকে অস্বীকার করে জমাট বেদনার কথা ছড়িয়ে দিচ্ছে আমার শহর জানে আকাশের বিশালতার সঙ্গে আমার জ্যাকেটের নীল রঙের একটা নিবিড়তা আছে আর সে কারণেই আকাশের নীল গলা জড়িয়ে আমার জ্যাকেটের ভ্রমণ শেষে জ্যাকেটের গায়ে লেগে থাকে আকাশের শীতলগন্ধ শুধু মাঝে মধ্যে ঘন মেঘের কাছাকাছি এসে জ্যাকেটের গায়ে লেগে যায় কিছু অন্ধকার এবং যে কোনও আল্ট্রাশক্তি শব্দ ডিটার্জেন্টে একবার ডোবালেই জ্যাকেটটি বৃষ্টির পরে মেঘমুক্ত আকাশ হয়ে ওঠে
রাত্রি বিষয়ক
................
রাত্রি ধোয়া কালো জল বহুমুখী জলধারায় প্রবাহিত হচ্ছে আর এই প্রবাহের মধ্যেই পরিশুদ্ধ হবে শহরের প্রতিটি পানীয়জলের ভাগচাষী পরিবার । অসম্ভব দীন হয়ে পড়ছে শুদ্ধ জলরেখা এবং নাব্যতা নিয়ে সুস্পষ্ট সন্দেহের নোনাজলে ছিপ হাতে বসে আছে টমেটো চাষি ।
বন্ধ কারখানার গা ঘেঁষে তৈরী হচ্ছে অসংখ্য বিউটিপার্লারের স্বাগতম সম্মোহন ওরা পেঁচাদের কাছ থেকে শিখে নিচ্ছে রাত্রি প্রিয় মগ্নতার গূঢ় নকশিকাঁথার স্কেচ । শুভরাত্রি শব্দের ব্যাপক ব্যবহারে ক্লিশে হয়েছে ভোরের পাখিরা এখন চিরসূর্যের স্টিলফ্রেমে নির্বাসিত ।
শব্দকোষ ছেড়ে কবি এগিয়ে যাচ্ছেন আলোকিত ব্যালকনিতে এবং রাত্রির অসংখ্য এলবামচিহ্ন থেকে অনুভব করছেন প্রজাপতির কম্পন ।
কবি রজতশুভ্র গুপ্ত আমাদের ছেড়ে অনেকদিন আগেই চলে গেছেন । কিন্তু দুর্গাপুরের শিল্পশহর সহ আসানসোল বার্নপুর কুলটি রানীগঞ্জে এমন অনেক কবি এমন সব শক্তিশালী কবিতা আমাদের উপহার দিয়েছেন যা বাংলাভাষার কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে বারংবার । পাঠক সমালোচক কতিপয় বাণিজ্যিক পত্রিকার স্নেহধন্য কবির কবিতা পড়েই মনে করেছেন এদের ছাড়া বাংলা কবিতা অচল । হয়তো খ্যাতির চোখধাঁধানিতে চমকে উঠে আত্মমগ্ন কবি খ্যাত কবিদের চেয়ে শত গুণ ভালো লিখেও ভবিতব্য ভেবে হারিয়ে গেছেন । অতি প্রচারিত এই সব কবিদের জন্মদিন মৃত্যুদিন বা কয়েকটি মুখ ঘুরে ফিরে সোস্যাল মিডিয়ায় মুখ দেখিয়ে যাচ্ছেন । অন্বেষণ বিমুখ অলস অধিকাংশ তরুণ কবি সামান্য প্রচারের জন্য, এইসব কবির কবিতার নীচে গদগদ হয়ে ভক্তি নিবেদন করে যাচ্ছে, চিরকালের ট্র্যাডিশন বজায় রেখে একইভাবে । বিখ্যাত কবিদের অবশ্যই ভালো কাজ আছে । কিন্তু তাঁদের কাজের চেয়ে সাংগঠনিক ক্ষমতার গুণে তাঁদের প্রাপ্তির ভাঁড়ার ভরে উঠছে বারংবার । না এখন কেউ সেভাবে কবিতার অন্বেষণ করে, না তার ধারাবাহিক ইতিহাসের দিকে নজর আছে । যতদিন তরুণ কবির জ্যাত্যাভিমান এবং নির্মোহ মনোভাব তৈরী হচ্ছে, যতদিন খাঁটি আলোচক গ্রাম গঞ্জ শহর মফস্বল খুঁজে প্রকৃত কবিতার আলোচনা না করছেন, ততদিন বাংলা কবিতার অভিশাপ থেকে মুক্তি নেই । কেউ কেউ এ কাজ করেছেন । যেমন প্রভাত চৌধুরী, বারীন ঘোষাল, সমীর রায়চৌধুরী, স্বপন রায়, নাসের হোসেন, রুদ্র কিংশুক, উমাপদ কর প্রমুখ । কিন্তু কয়েকশো বুদ্ধদেব বসুর দরকার আমাদের । নির্মোহ দৃষ্টিতে লিখতে হবে বাংলা কবিতার অজানা ইতিহাসের ইস্তেহার...
এই ধারাবাহিকের এই পর্ব শেষ করবো, এই পর্বের শুরুতে কবি তারক সেনের " ময়ূর পাখায় চাঁদ " কবিতাটির শেষ কয়েকটি পংক্তি তুলে ধরেছি সেই নিয়ে । সমস্ত শিল্পশহর যার অনেকটা নিয়ে আজ পশ্চিম বর্ধমান, সেই শিল্পশহর অনেক কৃতি প্রতিভার জন্ম দিয়েছে । তার মধ্যে, তারক সেন অনেক শক্তিশালী কলমের অধিকারী হয়েও আশ্চর্য ভাবে বাংলা কবিতার জগতে অকারণ উপেক্ষিত । যদিও কবিদের সুপারফাস্ট বাতানুকূল কামরায় গাদাগাদি করে বসবার ইচ্ছে তাঁর ছিলোনা কখনোই । তিনি এতোটাই মগ্ন ও প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন, যে তাঁর প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ তাঁকে যতটা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ও পরোপকারী ভালোমানুষ হিসেবে জানতেন ততটা কবি হিসেবে নয় । যদিও ছাত্রাবস্থা থেকে তিনি লেখালিখি শুরু করেন । লীলা রায় সম্পাদিত " জয়শ্রী ", বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত " কবিতা " ছাড়াও, দেশ, পরিক্রমা, মাসিক বসুমতী, দৈনিক স্বাধীনতায় নিয়মিত ধারাবাহিক ভাবে কবিতা লিখতেন । তাঁর যাবতীয় বইপত্র অদ্যাবধি প্রকাশিত, তা সম্ভব হয়েছে, তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও কাছের মানুষ কবি বিকাশ গায়েনের সৌজন্যে । আদ্যন্ত কবি ও শক্তিশালী গদ্যকার , বিকাশ দা' র সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় পঁচিশ ছাব্বিশ বছর । তিনি অনেক উল্লেখিত কাজ করেছেন, যা ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখে । কিন্তু মনে হয় বাংলা কবিতা প্রেমীদের কাছে, তারক সেনের লেখালিখিকে আনার জন্য তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই । কবি তারক সেন ১৯৮৬ সালের ১৫ ই মার্চ আমাদের ছেড়ে চলে যান, পরে, সেপ্টেম্বর ২০১৭ প্রকাশিত হয়, বিকাশ গায়েন এবং মানবেন্দু রায়ের সম্পাদনায়, তারক সেনের " কবিতা সংগ্রহ "...
এই বইটি বাংলা কবিতার একটি অমূল্য সংযোজন ।
আজ বেশি করে, বাংলা কবিতার গোষ্ঠী কোন্দলে বিদ্ধ, দাদাশ্ৰেণীর কলকাতাকেন্দ্রিক কিছু স্বঘোষিত কবিতার মাফিয়াদের বিরুদ্ধে এই কবির আত্মসম্মান আমাদের চিন্তনকে গর্বিত করে । যদিও কবিতার জগৎ অনেক বদলে গেছে । কয়েকজন কবি ও দু একটি পত্রিকার মৌরসীপাট্টাকে আর বিশেষ কেউ পাত্তা দেয় না । হাতের কাছে আছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং সোস্যাল মিডিয়া, ফেসবুক । এই সোস্যাল মিডিয়া ভেঙে দিয়েছে অনেক এক চেটিয়া আধিপত্যকে । একজন তরুণ নিজের লেখা নিজের টাইম লাইনে দিতে পারেন, প্রচুর ওয়েব ম্যাগাজিনে লিখতে পারেন, তাঁর লেখা পাঠকের ভালো লাগলে, কোন ট্যাগলাইন ছাড়াই পাঠক তাকে গ্রহণ করবে । এখন লেখালিখির মানচিত্রে কোনও কাঁটাতার নেই, দেশের ভূগোল নেই । এতদিন স্বঘোষিত গুরুর দল ও তাঁদের চ্যালারা যতোই গালাগালি দিক ফেসবুকের লেখালেখি নিয়ে, তাতে বোঝা যায় তাঁদের বাড়াভাতে ছাই পড়েছে ! হ্যাঁ, সব কিছুর ভালোমন্দ আছে । ফেসবুকে অন্য মাধ্যমের মতোই উৎকৃষ্ট অপকৃষ্ট লেখা আছে । থাকবেই । মহাকাল বসে আছে রায়দণ্ড নিয়ে । কোনও বেনিয়া মাফিয়া যে নেই সেটাই আনন্দের ।
তো যা বলছিলাম, সমস্ত গ্রাম মফস্বল সেমি টাউন প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক এলাকার কবি সাহিত্যিকদের যে শক্তি যে আত্মসম্মান, তাকেই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন কবি তারক সেন ।
তারক সেনের, কবিতা সংগ্রহে, তারক সেনের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে, কবি বিকাশ গায়েন যা বলছেন এক জায়গায়, সেটি তুলে ধরছি...
ময়ূর পাখায় চাঁদ, কবিতাটির সম্পর্কে কবি তারক সেনের নিজস্ব মত ছিলো, ওটা আমার বহু অভিজ্ঞতা আর আঘাতের জারিত ফসল ।
নিজের অভিজ্ঞতাকে ফাঁকি দেওয়া মানে শিল্পের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা, এ তো একান্ত আলোচনায় তাঁর মুখ থেকে আমাদের বহুবার শোনা । ছাঁচার চলে বান ডাকার স্মৃতি নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন । নদীকে চেয়েছিলেন নারীর প্রত্যাশায় । অথচ আমরা কেউ মেঘের মতো সংঘবদ্ধ হতে পারি নি । পাতার পর পাতা ভুল ইতিহাস হয়েছে, লেখা হয়েছে কবিতাও । সেইসব ইতিহাস পুনর্লিখন দূরের কথা, তার একটি পাতাও আমরা ছিঁড়তে পারি নি । অর্বানিটির কেমিকেল গোলাপজল যে আমাদের গায়ে । ক্যাফেটোরিয়ার কফি চাউমিনে লালিত হতে হতে ভুলেই বসেছি সেইসব শপথের কথা । কবি ভোলেন না । কোলকাতা হয়ে দাঁড়ায় মেট্রোপলিটন সভ্যতার প্রতীক । তিনি তার মুখোশ ধরে টান দেন...।
(ক্রমশ)
নিমসাহিত্য বিষয়ক অংশটি পড়ে ভালো লাগল । তবে কয়েকটি কথা আছে । শুরু হয়েছিল নিমসাহিত্য পত্রিকা নিয়ে । অল্প হলেও সুধাংশু সেন রবীন্দ্র গুহ । তারপর আর কোনো লেখক নিয়ে কথা নেই । মৃণাল বণিকের গল্প , বিমান চট্টোপাধ্যায়ের গল্প , সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা , অন্যান্য নিমকবিতা , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পের পাশাপাশি বিমানের মিরর-ইমেজ গল্প এসবের কোনো উল্লেখ নেই । একেবারে চিত্রনাট্যের কাট টু-র মতো এসে গেল মৃণালের গল্পগ্রন্থের কথা । ঐ গল্পগুলোই তো নিমসাহিত্য পত্রিকায় বেরিয়েছিল । বললে কোনো ক্ষতি ছিল না। মৃণাল এমন একজন কবি যিনি নিমসাহিত্য পত্রিকায় একটাও কবিতা লেখেননি, শুধুই নিমগল্প ।
তুমি যদি বল আমি ইতিহাস লিখতে বসিনি ,মেনে নেব । কিন্তু পাঠককে একটু উস্কে দিয়ে ছেঁড়া মেঘের মতো সরে যাবে এটাও তো মানা যায়…
পড়ছি। কবির ব্যক্তিগত জীবন আর কবিতার হয়ে ওঠা যেমন জানতে পারছি তেমনি প্রসঙ্গক্রমে কত অজানা অতীত/ইতিহাস তথ্যাকারেও জ্ঞাত হচ্ছি।